রঙলেপা- ( রঙে ভরা লেখক-পাঠক ফোরাম ) ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরেঃ পর্ব-৪৪ স্বপন চক্রবর্তী বাংলার স্বভাব কবি, চারণ কবি , মরমী তথা বাউল কবিদের কথা: পর্ব-৬

Home Page » সাহিত্য » রঙলেপা- ( রঙে ভরা লেখক-পাঠক ফোরাম ) ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরেঃ পর্ব-৪৪ স্বপন চক্রবর্তী বাংলার স্বভাব কবি, চারণ কবি , মরমী তথা বাউল কবিদের কথা: পর্ব-৬
রবিবার ● ২৫ অক্টোবর ২০২৬


স্বপন চক্রবর্তী  মরমীবাদ- সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে

লালন ফকির সম্পর্কে ধারনা নেই, এমন লোক খুব কমই আছে। লালনকে নিয়ে অনেক সাহিত্যিক, দার্শনিক ও পন্ডিত ব্যক্তি প্রচুর গবেষণা করেছেন। এখনও তা অব্যাহত আছে। বিভিন্ন পত্রপত্রিকা, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, নাটক কবিতা গল্প সিনেমা সব হয়েছে। তাঁর সম্পর্কে সকলেই কম-বেশি জানেন। তথাপী তাঁর সম্পর্কে কিছু তথ্য তুলে ধরছি।
লালন ফকির দীর্ঘায়ু লাভ করে ছিলেন। গবেষকগণের মতে তিনি ১১৬ বছরকাল জীবিত ছিলেন। লালনের মৃত্যূ হয় ১৮৯০ খৃষ্টাব্দের ১৭ অক্টোবর, শুক্রবার । সে হিসেবে তাঁর জন্ম সাল ১৭৭৪ খৃষ্টাব্দ। কুষ্টিয়া থেকে একটি পাক্ষিক বের হতো, নাম “ হিতকরী”। সেই পাক্ষিকটির একটি সংখ্যা লালনের মৃত্যুর পক্ষকাল পরেই প্রকাশিত হয় । সেখানে “ মহাত্মা লালন ফকীর “ নামে প্রকশিত একটি প্রবন্ধ থেকে লালন সম্পর্কে অনেক তথ্যই পাওয়া যায়। পাক্ষিক সংখ্যাটির বাংলা তারিখ ছিল ১২৯৭ এর ১২ কার্তিক। আর ইংরেজি তারিখ হয় ৩১ অক্টোবর, ১৮৯০ খৃষ্টাব্দ। প্রায় সকল গবেষক পত্রিকাটির উদ্ধৃতি দিয়েছেন।

গুরুর নির্দেশে লালন কুষ্টিয়া শহরের নিকটবর্তী ছেঁউড়িয়া গ্রামের ভিতর গভীর বনের একটি আম্রবৃক্ষের নিচে বসে সাধনায় নিযুক্ত হন। পরে কারিকর সম্প্রদায়ের উদার সাহায্য ও পৃষ্ঠপোষকতা তিনি লাভ করেছিলেন। তাদের অনুদানে গড়ে উঠে ছেঁউড়িয়ার আখড়া। অঞ্চলটি কারিকর-প্রধান অঞ্চল। লালনকে তারা আন্তরিক ভক্তি-শ্রদ্ধা করতো। তাদের আন্তরিক সহযোগিতাই লালনের প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়।

লালনের প্রথম জীবনের কাহিনী নিয়ে বিভিন্ন জনের লেখার মধ্যে অনেক সময় সামান্য পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। তবে মোটামোটি অনেকটাই প্রায় ঠিক আছে। খুব বা বিস্তর নয়। প্রথমে প্রখ্যাত লালন গবেষক,সংগ্রাহক আবুল আহসান চৌধুরীর লেখা থেকে লালনের প্রারম্ভিক জীবনের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিকে চাই।
প্রচলিত মতে. লালন সাঁই ১৭৭৪ সালে সেই সময়ের নদীয়া জেলার অধীন কুষ্টয়ার কুমারখালি থানার চাপড়া ইউনিয়নের অন্তর্গত গড়াই নদীর তীরবর্তী ভাঁড়ারা গ্রামে ( চাপড়া সংলগ্ন গ্রাম ) জন্মগ্রহণ করেন। হিন্দু কায়েস্থ পরিবারের সন্তান লালনের জনক-জননীর নাম যথাক্রমে মাধব কর ও পদ্মাবতী। জানা যায় লালন পিতামাতার একমাত্র সন্তান ছিলেন। শৈশবেই তিনি পিতৃহারা হন। আর্থিক অসঙ্গতির কারণে নিম্নস্তরের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাও গ্রহণ করতে পারেননি। চাপড়ার ভৌমিক-পরিবার তাঁর মাতামহ বংশ। সেকালে চাপড়া-ভাঁড়ারার গ্রাম ছিল লোকসংস্কৃতির একটি বিশিষ্ট কেন্দ্র। বাউলসঙ্গীত-কবিগান-হরিকীর্তনসহ নানা লোকসঙ্গীতের বিশেষ চর্চা ছিল এইসব গ্রামে। এই গ্রামীণ সাঙ্গীতিক ঐতিহ্যের পরিবেশেই লালনের জন্ম।
লালনের মাতামহের নাম ভষ্ম দাস। ভষ্মদাসের দুইপুত্র ও তিন কন্যা। পুত্রদ্বয়ের নাম যথাক্রমে কৃষ্ণ দাস ও রাজু ( রাজেন্দ্র) দাস। কন্যাত্রয়ের নাম; রাধামণি , নারায়নী, ও পদ্মাবতী। বিবাহোত্তর সময়ে লালন তাঁর বিধবা মাতাকে নিয়ে এই দাস পাড়া নামক বস্তিতে বাস করতেন। ফলে অনেকে লালনকে দাস বংশোদ্ভূত কায়েস্থ মনে করতেন। কিন্তু পিতৃ পরিচয়ে তিনি কর বংশীয় কায়েস্থ সম্প্রদায়ের লোক ছিলেন। দাসবংশ ও দাস পাড়াটি এখন বিলুপ্ত। নদী গর্ভে বিলীন।
একদা লালন কর দাস বংশীয় জনৈক বাউল দাস নামক কোন প্রতিবেশির সহিত মুর্শিদাবাদ জিলার বহরমপুরের নিকট গঙ্গাস্নানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। তখনও রেল ব্যবস্থা চালু হয়নি। তীর্থযাত্রীদের নৌকা ছিল যাতায়াতের মাধ্যম। সহযাত্রীদের সহযোগে গঙ্গাস্নান সেরে নিজ গৃহের উদ্দেশ্যে প্রত্যাবর্তনের সময় লালন মারাত্মক ভাবে বসন্তরোগে আক্রান্ত হন। রোগের প্রকোপ এতোই বেশি ছিল যে, ক্রমশ তাঁর সংঙ্গা লোপ পেতে থাকে। তাঁর দেহটি কালব্যাধির প্রচন্ড প্রকোপে মৃতবৎ অসাঢ় হয়ে পড়ে। একেতো ছুঁয়াচে ব্যাধি তারপর মৃত বলে ভ্রম হওয়ায় সঙ্গীগন বিপাকে পড়েন। অবশেষে মৃত ভেবেই তাঁকে যথাবিহিত অন্তেষ্টি ক্রিয়া সমাপন শেষে মুখাগ্নি করে গঙ্গায় নিক্ষেপ করেন। লালনের কায়েস্থ তথা হিন্দু জীবনের অন্তিম পর্বটি এখানেই প্রায় শেষ হয়ে যায়। সকল কড়িৎকর্মা সহযাত্রী যারা মুখাগ্নি পূর্বক দেহটি গঙ্গায় নিক্ষেপ করে মহান দায়িত্ব পালন করার আত্মতৃপ্তি লাভ করে ছিলেন, তারাই নিজগ্রামে ফিরে এসে লালনের তীর্থ পরিভ্রমণে ভাগ্যবান গঙ্গাপ্রাপ্তির সৌভাগ্যের কথা তাঁর জন্মদাত্রী জননী ও স্ত্রীর নিকট সুললিত ভাষায় বর্ণনা করে এবং নিজ নিজ সঠিক দায়িত্ব পালনের কৃতিত্ব নিয়ে প্রত্যেকের নিজ গৃহে ফিরলেন।
( চলবে )

বাংলাদেশ সময়: ২০:০১:৪১ ● ৩৭ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ