
সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে-৫
বাউলের ধর্মঃ
বাউলদের ধর্ম কি এমন একটা প্রশ্ন সবসময় সবার মনে ভেসে উঠে। অনেকের এ বিষয়ে জানার আগ্রহ দেখা যায়।
প্রখ্যাত লালন গবেষক আবুল আহসান চৌধুরীর মতে বাউল-সম্প্রদায় প্রচলিত সব আনুষ্ঠানিক ধর্মকেই অস্বীকার ও প্রত্যাখ্যান করেছেন। প্রচলিত ধর্মের তাত্ত্বিক বা দার্শনিক ধারণাকে অনেকক্ষেত্রে গ্রহণ করলেও তার আচরিক দিক সম্পর্কে কখনোই আগ্রহ পোষণ করেন নি। তাঁরা কোরান-পুরাণ, বেদ-বাইবেল কোনো ধর্মগ্রন্থকেই সেই অর্থে মান্য করেননি। সনাতন শাস্ত্র-আচারও প্রচলিত সমাজ-ধর্মের বিরুদ্ধেই তাঁদের বিদ্রোহ। সম্প্রদায় ধর্মের সংকীর্ণ প্রাচীর ভেঙে তাঁরা পেয়েছেন এক উদার মিলন-ময়দানের সন্ধান।
বাউল সংগ্রাম সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধির বিপক্ষে। অখন্ড মানবধর্মের পক্ষেই চিরকাল তাঁদের মনোযাগ নিবদ্ধ। সাম্প্রদায়িক মনোভাবকে তাঁরা কখনোই প্রশ্রয় দেননি। জাত বিচারের সংকীর্ণতাকে তাঁরা ঘৃণা করেছেন। জাত-ধর্মের গন্ডির বাইরে তাঁরা নিজেদের “ ব্রাত্য “ বলে ”মন্ত্রহীন” বলে পরিচয় দিয়েছেন।
লালনের গানে বারবার ছুঁৎমার্গ আর জাতপাঁতের অসারতা প্রকাশিত হয়েছে। এ-বিষয়ে সাধক লালন তাঁর দ্রোহের মনোভাব প্রকাশ করে দৃঢ়কন্ঠে বলেছেন:
জাত না গেলে পাইনে হরি
কি ছার জাতের গৌরব করি
ছুঁসনে বলিয়ে।
লালন কয় জাত হাতে পেলে
পুড়াতাম আগুন দিয়ে।
মোট কথা বাউলের সঙ্গে সাম্প্রদায়িক ধর্মের কোনো যোগ নেই। তাই তিনি তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির ভিতর দিয়ে জেনে ছিলেন জাত-ধর্মের অসারতা। তিনি নিজের জাত ধর্ম সম্পর্কে প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে যে জবাব পেশ করেছিলেন তাতে সম্প্রদায় ধর্মের অযৌক্তিতা ও অসারতার কথা ঘোষিত হয়েছে। আর তা হলো-
” সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে।
লালন বলে জাতের কি রূপ দেখলাম না এ নজরে।”
লালন এই জাত-ধর্মের খোলস দূরে সরিয়ে রেখেই সাধকদলে নাম লিখিয়ে ছিলেন। বাউলসাধনায় মানুষতত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। আরশিনগরের পড়শি যিনি তিনিই লালনের ‘ মনের মানুষ’ , তিনিই ‘ অলখ সাঁই’ , সাঁই নিরঞ্জন’ । এই মানুষের অন্বেষণেই বাউলের সাধনা নিয়োজিত। “ মানুষতত্ত্ব ভজনের সার” – এই হলো তাঁর মূল কথা।
তথ্যঋণ- সম্পাদকের ভূমিকা/ ড. আবুল আহসান চৌধুরী। মহাত্মা লালন ফকীর- পাক্ষিক হিতকরী, ফকির লালন শাহ-বসন্ত কুমার পাল। ফকির লালন শাহ- ড, উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। লালন শাহ- ড. আহমদ শরীফ-প্রমূখ।
( চলবে )