
বই মেলা সম্পর্কে কিছু লেখার আগে “ মেলা “ সম্পর্কে যৎসামান্য বলা দরকার। মেলা একটি সংস্কৃত শব্দ। যার অর্থ Gathering বা একত্রিত হওয়া। মেলা সাধারণত গ্রামবাংলার একটা লোকজ ঐতিহ্য। গ্রাম ভিত্তিক জীবনের বিনোদনের একটা অবলম্বন। এক সময়ে এর যথেষ্ট কদর ছিল। মানুষ তখন বলতে গেলে গ্রামেই বসবাস করতো। তার কারণ জীবন জীবিকা সবই ছিল গ্রাম ভিত্তিক। শহুরে জীবন মানুষের প্রিয় ছিল না, প্রয়োজনও ছিল না। বিনোদন এবং সমকালীন সাংসারিক তৈজষপত্র ক্রয় ইত্যাদি তখন মেলা থেকেই সংগ্রহ করা হতো। ক্রমান্বয়ে মানুষ জীবিকার তাগিদে, শিক্ষা চিকিৎসা চাকুরি ব্যবসা আইন-আদালত প্রভৃতির প্রয়োজনে শহর কেন্দ্রিক জীবনে অভ্যস্থ হতে থাকে। গ্রামের মানুষের শিক্ষার প্রয়োজনে শহর মুখী হতে থাকে মানুষজন। আর শিক্ষিতি হলেই যোগ্যতার ভিত্তিতে কর্ম খুঁজতে থাকে। তখন আর গ্রাম্য জীবনে থাকার সুযোগ থাকে না। হয়ে উঠে সবাই শহর মুখি। কিন্তু তথাপী নারীর টান এবং গ্রামীণ স্বাদ অনুভবের তাগিদে অনেক মেলাকেই নগর কেন্দ্রিক করে জায়গা করে দিয়েছে। অর্থাৎ দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে চেষ্টা করে। প্রকৃতিতে ফুটে উঠা সুন্দর ফুল ফল লতাপাতাকে তুলে এনে ড্রইং রুমের দামী ফুলদানিতে সাজানোর একটা চেষ্টা মাত্র। কিন্তু সেই সুগন্ধ কি আর টেকসই হয়? গ্রামীণ আবহে গড়ে উঠা মেলা। তন্মধ্যে বারো মাসের তেরো পার্বণ ভিত্তিক অনেক মেলা গ্রাম বাংলার পরম বিনোদনের মাধ্যম ছিল এক সময়। যেমন চৈত্র সংক্রান্তি মেলা, পৌষ পার্বনের মেলা, রথযাত্রার মেলা, ঈদ মেলা, বারুণী স্নান মেলা, অষ্টমী স্নান মেলা ছাড়াও বিভিন্ন পূজার মেলা ইত্যাদি গ্রামে লেগেই থাকতো। যাত্রা থিয়েটার, সার্কাস, পুতুল নাচ, ঘোড় দৌড়, নৌকা বাইচ, বাউল গান, কবি গান, মারফতি গান, জারি সারি, ভাটিয়ালি গান, ঝুমুর যাত্রা, গীতিনাটক ইত্যাকার আরও কত কি। সবই ছিল লোকজ সংস্কৃতির অন্তর্গত। কিন্তু মানুষ যখন কর্মব্যস্ত হতে থাকে এবং নাগরিক জীবন বেছে নিতে বাধ্য হয়, তখন জীবন-বৈচিত্র ও বিনোদনের জন্য গ্রামীণ মেলাকে শহরে আমদানি করা হতে থাকে। তবে আবার কিছু কিছু মেলা শহর ভিত্তিক যে ছিল না তা কিন্তু নয়। তবে তা একবারেই সামান্য। যেমন বাণিজ্য মেলা, বিজ্ঞান মেলা ,রপ্তানী মেলা ইত্যাদি। ঠিক অনুরূপ শহরজাত একটি মেলা হলো বই মেলা। এই মেলার ব্যাপ্তি এখন শহর থেকে গ্রাম মুখীণ হতে চলেছে। গ্রামের ছোট ছোট শহর, স্কুল কলেজ ইত্যাদিতে এখন বই মেলার আসর বসতে দেখা যায়।
চিত্তরঞ্জন সাহা, একজন বই প্রকাশ ও বই ব্যবসায়ী এবং বই প্রেমি মানুষ। তিনি প্রথমে একটা চটের বস্তা বিছিয়ে বই নিয়ে বসেন । স্থানটি বর্তমান বাংলা্ একাডেমির বট তলা। এটা এক সময় বর্ধমান হাউস নামে পরিচিত ছিল। তিনি প্রকাশনা জগতের এক বিষ্ময়কর, চিরস্মরণীয় ব্যক্তি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন অন্যান্য অনেকের মতো তিনি ভারতের কোলকাতায় আশ্রয় নিয়েছিলন। কোলকাতায় তখন বাংলাদেশের বহু লেখক, শিল্পী ,সাহিত্যিক,বুদ্ধিজীবী আশ্রয় নিয়ে ছিলেন। কোলকাতাতেই তিনি বই প্রকাশের একটা উদ্যোগ নেন। তিনি তখন মুক্তিযুদ্ধের উপর মুল্যবান ৩২টি বই প্রকাশ করেন। অতপর দেশ স্বাধীন হলে পরের বছর অর্থাৎ ১৯৭২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারী বর্তমান বাংলা একাডেমির বট তলায় শুধু মাত্র চটের বস্তা বিছিয়ে বইয়ের একটি দোকান দেন। তখন মোট বইয়ের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩২টি। কোলকাতায় প্রকশিত মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক এসব বই নিয়েই যাত্রা শুরু হয়েছিল মেলাটির। এটাই ছিল ” অমর একুশে বই মেলা “ নামক বৃহৎ একটি বই মেলার গোড়াপত্তন। সে সময়ে বাংলা একাডেমিও হ্রাসকৃত মূল্যে বই বিক্রি শুরু করে। তন্মধ্যে চিত্তরঞ্জন সাহার স্বাধীন বাংলা সাহিত্য পরিষদটি ছিল একমাত্র বেসরকারী ও নিজস্ব প্রতিষ্ঠান। পরে এই “স্বাধীন বাংলা সাহিত্য পরিষদ” নামীয় সংস্থাটির নাম পরিবর্তন হয়ে নাম হয় “ মুক্তধারা প্রকাশনী”।
মানুষের আগ্রহ ও ভালোবাসায় মেলাটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠে। ক্রমান্বয়ে অপ্রতিহত গতিতে তা বেড়েই চলে। তা দেখে অনেককেই ভাবতে হয়। অনেক সময় আমরা নিজেরা কোন কৃতিত্ব দেখানোর চেয়ে অন্যের কৃতিত্ব দখল, ইতিহাস ও ঐতিহ্য দখল, সম্পদ দখল , অবদান দখল, গানের সুর দখল, সিনেমা- নাটকের কাহিনী দখল ইত্যাদিতে খুব পাকাপোক্ত। কোন সমালোচনার ভয়ও করি না। এ ইতিহাসও হয়তো এক সময়ে আমরা বিস্মৃত হবো হয়তো। তা হোক, আমার বক্তব্য হচ্ছে বই পড়ার উপযোগীতা, উপকারিতা, আগ্রহ ইত্যাদি কোন সময়েই ম্লান হবে না।
চিত্তরঞ্জন বাবু ১৯৭২ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত একাই চালিয়ে যান এ বই মেলাটি। তখন মানুষের আগ্রহ ও জনপ্রিয়তা দেখে বাংলা একাডেমি এটাকে স্বীকৃতি দানের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। ফলে ১৯৭৯ সালে যুক্ত হয় বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি নামীয় একটি সংস্থা। উল্লেখ্য যে, এ সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতাও ছিলেন চিত্তরঞ্জন সাহা। এটা শুধু যে একটা বই মেলা ছিল তা কিন্তু নয়। ভাষা আন্দোলনের আত্মাহুতি দাতা বীর শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানোও ছিল এর উদ্দেশ্য। ক্রমান্বয়ে এর ব্যাপ্তি বাংলা অ্যাকাডেমির গন্ডি ছাড়িয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত বিস্তার লাভ করে। তবুও যেন স্থান সংকুলান হয়না। বহু আগে থেকেই স্টল বরাদ্দের জন্য আবেদন নিবেদন করতে হয়। এই বই মেলা এখন বিভিন্ন ভাবে বিভক্ত হয়ে আছে। শিশুদের জন্য বন্ধের দিন গুলোতে সকাল এগারোটা থেকে বরাদ্দ থাকে। বিকেল হতেই শুরু হয় সাধারনের জন্য। শিশুদের বিনোদন দানের জন্য লেখা বই থাকে, থাকে কার্টুনের ব্যবস্থা। আরও অনেক কিছু থাকে যাতে শিশুরা খুব তৃপ্ত হয়।
যাহোক, পরে ১৯৮৪ সালে এর কিছু নীতিমালা প্রণয়নের তাগিদ অনুভুত হয়। তাই নাম হয় “ অমর একুশে গ্রন্থমেলা” । আবার ২০২৩ সালে এসে এর নাম হয় “ অমর একুশে বই মেলা”। ( চলবে )