
[ ১]
উদ্যানে গ্লাস টাওয়ারের সামনে এক লোক খেঁকিয়ে বলে উঠলো!
“ শুন! আমার লগে মাথা গরম দেখাবিনা। স্বামীর পায়ের নিচে স্ত্রীর বেহেশত।”
পাশে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে নারীটি মুখ ঝামটা মেরে উত্তর দিল: “ তোদের মত বেডাদের পায়ের তলেই মাগীদের জান্নাত! থু !”
লোকটা সজোরে তার গালে চড় বসিয়ে দেয়।
আমিফয়া বেগম উদ্যানে, টিএসসিতে চুরি বিক্রি করে বেড়ায়। ছোট্ট একটা মেয়ে ছিল- মেট্রোরেলের কাজ করার সময় হারিয়ে যায়। আদৌ বেঁচে আছে কিনা মরে গেছে জানা যায়নি। গরীবদের মৃত্যু নিয়ে কখনো ভাবতে নেই।
স্বামী আসগর আলী টোটো কোম্পানির মালিক। অর্থাৎ, দিন-রাত জুয়া খেলে, গাঁজার আসরে গানের তালে তালে নাচে। কখনো বা বকশিবাজার পেরিয়ে বিউটির আখে দোখা করতে যায়। মাঝে মধ্যে একসাথে রাতও কাটিয়ে আসে। বিউটির সাথে দেখা বারতে গেলেই মিষ্টিপান, লিপস্টিক, মালা, বেলীফুল নিয়ে যাবে। তবুও বিউটির মন গলে না-তার ভাষায়: “বাজারের মাইয়াগো মন নাই, শরিলডাই আছে! তোর মত বিয়াত্তা বেডারে গুনার টাইম নাই আমগোর। আসবি, সার্ভিস নিবি, টেকা দিবি । থু! ফুলডা বউরে দিস, শরম করে না বউয়ের টেকায় ফূর্তি করতে আহোস!”
আসগরের মুখে নির্লজ্জতার ছাপ। বিটকেলে ‘হাসি। পুরুষ হয়ে জন্মে যদি নারী ভোগ না করতে পারে- এটা তার জন্য লজ্জাজনক হতো।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল। চকবাজার হতে কম দামে কিছু পুজি সঞ্চয় করে এক ডালা রেশমি চুরি কিনেছিল আফিয়া। উদ্যানের গেট বরাবর এক পাশে বসে। পাশে ফুলের মালা নিয়ে তেরো বছরের বাচ্চা মেয়েটা দাঁড়িয়ে নিজের অস্তিত্বের সাথে লড়াই করে। সেই মেয়ের মা ঘরে ঘরে ঝি -চাকরানীর কাজ করে বেড়ায়। বাবাকে কখনো জন্ম হতেই
দেখে নি। গেল বইমেলায়- ‘ছোট্ট ভাইটার হাত ধরে হাওয়াই মিঠাই বিক্রি করেছিল। কথা ছিল লাভের টাকায় ফুচকা-আইসক্রিম খাবে। পয়সা ঠিকই রোজগার হয়েছিল; দুইদিন পর ছোট ভাইয়ের ভীষণ ডেঙ্গু জ্বর হয়। এই জ্বর বেচারাকে আর আইসক্রিম খাওয়ার ‘সৌভাগ্য করে নি। চিরদিনের জন্য নিরুদ্দেশ হয়ে গেল ।
আফিয়া মেয়েটাকে নিজের মেয়ের মতোই স্নেহ বারে। বাচ্চা মেয়েটার মাঝে যেন নিজের সন্তানের ছায়া খুঁজে পায়। রাত যত বাড়ে, এই দ্বীর্ঘশ্বাস যেন কাটতে চায় না। কার কাছে লুকোবে দুঃখ? কোথায়
শান্তি মিলবে? ঘরের পুরুষই দূরে সরে গেছে - মদ, নারী নিয়ে বেজায় ফুর্তিতে রয়েছে। আফিয়া কোন আশায় বেঁচে রয়েছে নিজেও জানে না। মৃত প্রায়, জীবিত থেকেও যেন মৃত! ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে হারিয়ে যাওয়া সন্তানকে প্রায়ই ডাকতে থাকে-
“ কাজল রে! আমার কাজল পাখিরে….”
কিন্তু এই অসময় নিয়ে বেঁচে থাকা যায় কয়দিন ?
এমনি এক দীর্ঘশ্বাসের রাতে-গোপন সমসত দুঃখ রেখে বেরিয়ে পড়ে আফিয়া। গন্তব্য আপাতত কমলাপুর রেলস্টেশন। যাওয়ার পূর্বে ‘দুঃসাহসী করে যায় । ভাঙা কাচের বোতলটির টুকরো আসগরের রক্তে মিশিয়ে দিয়ে যায়! আসগর এখন থেকে অন্য জগতে শান্তিতে থাকবে। চাহিদার অবসান ঘটলো।
–
( চলবে)