হাওরের জীববৈচিত্র্যের উপর প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাবঃ টাঙ্গুয়ার হাওরের উপর একটি সমীক্ষা: মো. মিজানুর রহমান
Home Page » বিজ্ঞান-প্রযুক্তি » হাওরের জীববৈচিত্র্যের উপর প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাবঃ টাঙ্গুয়ার হাওরের উপর একটি সমীক্ষা: মো. মিজানুর রহমান
![]()
গবেষণা তত্ত্বাবধায়ক
ড. মোঃ জাকিরুল ইসলাম
সহযোগী অধ্যাপক (ভূগোল)
ওপেন স্কুল
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়
উপস্থাপনায়
মো: মিজানুর রহমান
আইডি নং: ২৪-০-০৯-৯৯৯-০১৮
২য় ব্যাচ, ৪র্থ সিমেস্টার
মাস্টার অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট (এমডিএম) প্রোগ্রাম
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়
জমাদানের তারিখঃ এপ্রিল, ২০২৬ ইং
প্রত্যয়ন পত্র
এই মর্মে প্রত্যয়ন করা যাচ্ছে যে, মোঃ মিজানুর রহমান, আইডি নং: ২৪-০-০৯-৯৯৯-০১৮, বাংলাদেশ উম্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপেন স্কুল পরিচালিত মাস্টার অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট (এমডিএম) প্রোগ্রামের ২য় ব্যাচ, ৪র্থ সিমেস্টারের একজন শিক্ষার্থী। তিনি আমার তত্ত্বাবধানে “হাওরের জীববৈচিত্র্যের উপর প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাবঃ টাঙ্গুয়ার হাওরের উপর একটি সমীক্ষা” বিষয়ক গবেষণা কার্যক্রমটি সম্পন্ন করেছেন।
………………………..
ড. মোঃ জাকিরুল ইসলাম
সহযোগী অধ্যাপক (ভূগোল)
ওপেন স্কুল
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।
ঘোষণাপত্র
আমি মোঃ মিজানুর রহমান, আইডি নং: ২৪-০-০৯-৯৯৯-০১৮ বাংলাদেশ উম্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের এমডিএম প্রোগ্রামের ২য় ব্যাচ, ৪র্থ সিমেস্টারের একজন শিক্ষার্থী। আমার গবেষণা বিষয় হচ্ছে “হাওরের জীববৈচিত্র্যের উপর প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাবঃ টাঙ্গুয়ার হাওরের উপর একটি সমীক্ষা”। এটি আমার নিজস্ব পঠিত বিষয়ের জ্ঞান। সরেজমিনে পরিদর্শন, বিভিন্ন বই-পত্র, পত্রিকা ও ওয়েবসাইট থেকে সংগৃহিত তথ্যাদির আলোকে উপস্থাপনার চেষ্টা করেছি। এই অর্পিত কাজে কোন প্রকার হুবহু অনুলিপি বা নকল করা হয়নি । শুধু তথ্য উপাত্ত ব্যবহার করেছি। অত্র গবেষণা প্রতিবেদন বা এর অংশ বিশেষ কোথাও প্রকাশ করেনি বা প্রকাশের জন্য কোথাও জমা দেইনি। এই গবেষণা প্রতিবেদন আমার নিজস্ব কর্ম ।
……………………
মোঃ মিজানুর রহমান
আইডি নং: ২৪-০-০৯-৯৯৯-০১৮
২য় ব্যাচ, ৪র্থ সিমেস্টার
মাস্টার অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট (এমডিএম) প্রোগ্রাম
ওপেন স্কুল
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।
কৃতজ্ঞতা স্বীকার
এই গবেষণা কর্ম সম্পাদন করায় যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করেছে তাদের সবার প্রতি আমি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করছি। তাছাড়া মহান সৃষ্টিকর্তা ও মা-বাবার নিকট। এরপর আমি আন্তরিক শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার করছি আমার তত্ত্বাবধায়ক ড. মোঃ জাকিরুল ইসলাম, সহযোগী অধ্যাপক (ভূগোল), ওপেন স্কুল, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়। যিনি গবেষণা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। ফলে গবেষণা কর্মটি সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে। মাঠে কাজ করার বাস্তবিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ দেয়ার জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। সময় ও কাজের ক্ষতি করে যে সকল উত্তরদাতা আমার গবেষণার প্রশ্নমালার উত্তর সংগ্রহের সহায়তা করেছেন তাদের প্রতিও আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করছি।
……………………
মোঃ মিজানুর রহমান
আইডি নং: ২৪-০-০৯-৯৯৯-০১৮
২য় ব্যাচ, ৪র্থ সিমেস্টার
মাস্টার অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট (এমডিএম) প্রোগ্রাম
ওপেন স্কুল
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।
সারসংক্ষেপ
টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র্যের উপর প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব একটি গুরুতর উদ্বেগ, যা জলবায়ু পরিবর্তন, যেমন আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের কারণে আরও খারাপ হচ্ছে। এছাড়া, দূষণ, বন উজাড়, এবং অতিরিক্ত মাছ ধরাও এর জন্য দায়ী। এসবের সম্মিলিত প্রভাবে এখানকার অনন্য জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে স্থানীয় জনগণের জীবন-জীবিকার উপর। টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রাকৃতিক এবং মানবসৃষ্ট উভয় প্রকার দুর্যোগই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সমীক্ষায় দেখা যায় যে, ঘন ঘন বন্যা, পাহাড়ি ঢল, অতিরিক্ত সার ও কীটনাশকের ব্যবহার, শিল্প-পর্যটন বর্জ্য এবং অপরিকল্পিত মৎস্য আহরণ মিলেমিশে হাওরের পরিবেশকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য দীর্ঘমেয়াদী এবং সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। এই গবেষণায় সুনামগঞ্জ জেলার টাঙ্গুয়ার হাওরে অবস্থিত এলাকা মধ্যনগর উপজেলার দুইটি ইউনিয়নের উপর সমীক্ষা পরিচালনার মাধ্যমে হাওরের জীববৈচিত্রের উপর প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণ, প্রভাব এবং প্রতিকারমূলক ব্যবস্থাগুলোর বাস্তবচিত্র বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় মোট ১০০ জন উত্তরদাতার উপর প্রশ্নমালার ভিত্তিতে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। ফলাফলে দেখা যায়, ১২০টি বিল নিয়ে ৯৭৮৭ হেক্টরের টাঙ্গুয়ার হাওর। এ হাওরে ভরপুর বিপুল প্রাণ-প্রকৃতির। আমরা যা দেখি পানির উপরে, শুধু তা-ই নয়। পানির নিচে রয়েছে হাওরের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। কারেন্ট জাল, ভেটজাল, লাঠিজালসহ বিভিন্ন জাল দিয়ে প্রতিদিন ৪-৫শ’ নৌকা এখানে মাছ ধরে। পোনা মাছ থেকে মা মাছ সবই তারা ধরছে। মাছ ধরার নিয়ম-নীতি না মেনে মাটি ঘেঁষে জাল টানার কারণে হাওরের নিচে থাকা জলজ প্রাণী এবং বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
প্রধান প্রভাব সমুহের কারণ হিসেবে উত্তরদাতারা উল্লেখ করেছেনঃ অতিবৃষ্টি এবং পাহাড়ি ঢল হাওরের পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট করে। বন্যা পরিস্থিতি স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পর্যটন, কৃষি ও শিল্প বর্জ্য থেকে সৃষ্ট রাসায়নিক পদার্থ পানির গুণগত মান নষ্ট করছে। নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করে মাছ ধরার কারণে পানির নিচের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে। ইঞ্জিনচালিত নৌকার ধোঁয়া এবং হাউসবোটের ব্যবহার পরিবেশের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং দূষণের কারণে মাছ, কাঁকড়া, হিজল ও করচের মতো প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নির্ভরশীল স্থানীয় মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে। জীববৈচিত্র্য সংকটাপন্ন অবস্থা থেকে আরও বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে।
সূচীপত্র
|
ক্রঃ নং |
অধ্যায় ও শিরোনাম |
পৃষ্ঠা নং |
প্রথম অধ্যায়
ভূমিকা
১.১ ভূমিকা
টাঙ্গুয়ার হাওর সুনামগঞ্জ জেলার মধ্যনগর ও তাহিরপুর উপজেলার মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত। মেঘালয় পাহাড় থেকে ৩০টিরও বেশি ঝরা (ঝরনা) এসে মিশেছে এই হাওরে। দুই উপজেলার ১৮টি মৌজায় ৫১টি হাওরের সমন্বয়ে ১২,৬৬৫ হেক্টর এলাকা নিয়ে টাঙ্গুয়ার হাওর জেলার সবচেয়ে বড় জলাভূমি। পানিবহুল মূল হাওর ২৮ বর্গকিলোমিটার এবং বাকি অংশ বসতি ও কৃষিজমি। হাওর এলাকার ভেতরে ও তীরে ৮৮টি গ্রাম আছে। একসময় গাছ-মাছ-পাখি আর প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্যের আধার ছিল এই হাওর। ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দে টাঙ্গুয়ার হাওরকে ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়, তখনই অবসান হয় দীর্ঘ ৬০ বছরের ইজারাদারির। ২০০০ খ্রিষ্টাব্দে ২০ জানুয়ারি এই হাওরকে ‘রামসার স্থান’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। আইসিইউএন এই হাওরের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কাজ করছে। হাওর এলাকার মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন, সম্পদ সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও সুইজারল্যান্ড সরকারের মধ্যে ২০০১ খ্রিষ্টাব্দে ১২ ফেব্রুয়ারি একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। ২০০৩ খ্রিষ্টাব্দের ৯ নভেম্বর থেকে হাওরের নিয়ন্ত্রণ নেয় জেলা প্রশাসন। সুইস অ্যাজেন্সি ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কো-অপারেশন (এসডিসি) এবং আইসিইউএন ২০০৬ সালের ডিসেম্বর থেকে ‘টাঙ্গুয়ার হাওর সমাজভিত্তিক টেকসই ব্যবস্থাপনা’ প্রকল্প পরিচালনা করছে। শীত মৌসুমে পানি শুকিয়ে কমে গেলে এখানকার প্রায় ২৪টি বিলের পাড় (স্থানীয় ভাষায় কান্দা) জেগে উঠলে শুধু কান্দার ভিতরের অংশেই আদি বিল থাকে, আর শুকিয়ে যাওয়া অংশে স্থানীয় কৃষকেরা রবিশস্য ও বোরো ধানের আবাদ করেন। এ সময় এলাকাটি গোচারণভূমি হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। বর্ষায় থৈ থৈ পানিতে নিমগ্ন হাওরের জেগে থাকা উঁচু কান্দাগুলোতে আশ্রয় নেয় পরিযায়ী পাখিরা রোদ পোহায়, জিরিয়ে নেয়। কান্দাগুলো এখন (২০১২) আর দেখা যায় না বলে স্থানীয় এনজিও ও সরকারি ব্যবস্থাপনায় সেখানে পুঁতে দেয়া হয়েছে বাঁশ বা কাঠের ছোট ছোট বিশ্রাম-দণ্ড। টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র্য গবেষণার মূল ভূমিকা হলো এর জীববৈচিত্র্যের বর্তমান অবস্থা মূল্যায়ন করা, বিপন্ন প্রজাতি শনাক্ত করা এবং জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় টেকসই সমাধান খুঁজে বের করা। এই গবেষণা হাওরের জলজ সম্পদ, পাখির আবাসস্থল ও সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ওপর পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং মানুষের কার্যকলাপের প্রভাব নিরূপণ করতে সহায়তা করে। এর মাধ্যমে প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ, পর্যটনের টেকসই ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকা উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়।
১.২ গবেষণার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র্যের উপর প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব বিষয়ক একটি সমীক্ষা গবেষণার মূল লক্ষ্য হলো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে হাওরের পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর কী ধরনের ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে, তা মূল্যায়ন করা। এর প্রধান উদ্দেশ্যগুলো হলো:
- প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব চিহ্নিত করা: বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন - বন্যা, পাহাড়ি ঢল, অতিবৃষ্টি এবং খরা টাঙ্গুয়ার হাওরের বাস্তুতন্ত্রের উপর কী ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, তা নির্ণয় করা।
- জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি নিরূপণ: দুর্যোগের কারণে মাছ, পাখি এবং অন্যান্য জলজ ও স্থলজ প্রাণীর সংখ্যা হ্রাস, প্রজনন ব্যাহত হওয়া, এবং আবাসস্থল ধ্বংস হওয়ার মতো ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন করা।
- সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণ: জীববৈচিত্র্যের উপর দুর্যোগের প্রভাব কীভাবে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা (যেমন - মাছ ধরা, কৃষি) এবং আর্থ-সামাজিক অবস্থার উপর প্রভাব ফেলছে, তা পরীক্ষা করা।
- প্রতিকারমূলক সুপারিশ প্রদান: গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে, টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সুপারিশ তৈরি করা।
১.৩ সমস্যার বিবৃতি
টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র্যের উপর প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব এবং এটি নিয়ে সমীক্ষার সম্ভাব্য সমস্যাগুলো হলো বন্যা, পাহাড়ি ঢল ও অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, যা জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদের জীবনচক্রকে ব্যাহত করে, প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস করে এবং মানুষের জীবন ও জীবিকাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সমীক্ষার সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে দুর্যোগের পূর্বাভাস এবং ব্যবস্থাপনার অভাব, মানবসৃষ্ট দুর্যোগ যেমন অতিরিক্ত মাছ ধরা, নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পর্যটকদের কার্যকলাপ, যা প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করছে।
- বন্যা ও পাহাড়ি ঢল: অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলের কারণে হাওরের জলজ জীব ও পাখিদের প্রজননকালীন সময়ে মারাত্মক ক্ষতি হয়।
- জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি: বাঁধ ভাঙা বা অতিরিক্ত পানির কারণে জলজ জীব ও উদ্ভিদের স্বাভাবিক প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস হয়ে যায়।
- জীবিকা হ্রাস: প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে মাছ ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের সংখ্যা হ্রাস পায়, যা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা ও আর্থ-সামাজিক অবস্থার ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
- সম্পদের অপব্যবহার: দুর্যোগের সময় অনেক সময় মানুষ বেঁচে থাকার তাগিদে অতিরিক্ত মাছ ধরে, যা জীববৈচিত্র্যের জন্য আরও ক্ষতিকর।
- মানব সৃষ্ট দুর্যোগ: টাঙ্গুয়ার হাওর একটি ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ হিসেবে ঘোষিত হওয়া সত্ত্বেও, অতিরিক্ত পর্যটক, হাউসবোটের ব্যবহার, উচ্চ শব্দ ও বর্জ্য ফেলার মতো মানবসৃষ্ট কারণগুলো পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের মারাত্মক ক্ষতি করছে।
- পর্যটকদের সচেতনতার অভাব: পর্যটকদের অসচেতনতা ও দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ, যেমন- হাওরে বর্জ্য ফেলা এবং উচ্চ শব্দে গান বাজানো, হাওরের পরিবেশের জন্য বড় হুমকি
১.৪ গবেষণার বিষয়বস্ত
এই গবেষণার বিষয়বস্তু হলো “টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র্যের উপর প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব: একটি সমীক্ষাধর্মী বিশ্লেষণ।” গবেষণাটি বাংলাদেশের সুনামগঞ্জ জেলার মধ্যনগর উপজেলার টাঙ্গুয়ার হাওর তীরবর্তী দুইটি ইউনিয়ন, বংশীকুন্ডা উত্তর এবং বংশীকুন্ডা দক্ষিণ নিয়ে করা হয়েছে।
জীববৈচিত্র্যে রক্ষায় প্রশ্নমালার আলোকে পূর্নাঙ্গ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি নীতি নির্ধারক ও প্রশাসনের জন্য সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক সুপারিশ প্রদান করা হয়েছে।
১.৫ গবেষণার প্রশ্ন
টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র্যের উপর প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব জানতে নিচের প্রশ্নগুলোর আলোকে মধ্যনগর উপজেলার দুটি ইউনিয়নের লোকজনের উপর করা হয়েছে, যাতে টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র্যের উপর প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব সম্পর্কে সঠিক তথ্য উন্মোচনে সহায়তা করবে। যা নিচে উপস্থাপন করা হলো।
- আপনি কি গত দশ বছরে টাঙ্গুয়ার হাওরে কোন ধরণের প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখেছেন?
- মাছ ধরা, কৃষি বা অন্য কোনো পেশার ক্ষেত্রে কী ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে?
- দুর্যোগের পর জীববৈচিত্র্যের (যেমন মাছ, পাখি, উদ্ভিদ) ওপর কী ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করেছেন?
- হাওরে হাউসবোট বা পর্যটকদের আনাগোনা কি জীববৈচিত্র্যের উপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে?
- প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে আপনার আর্থিক অবস্থার কোন পরিবর্তন হয়েছে কি?
- হাওর অঞ্চলের মানুষের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা কি জরুরি?
- আপনি কি জীববৈচিত্র্য এবং পরিবেশ সংরক্ষণে কোনো ধরনের সচেতনতামূলক কাজে জড়িত আছেন?
- প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য সরকারের কাছে আপনার কোনো বিশেষ আবেদন আছে কি?
১.৬ গবেষণার যৌক্তিকতা (Rationale for the Study):
১. গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি: টাঙ্গুয়ার হাওর একটি রামসার সাইট, যা বিশ্বব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি (Wetland of International Importance) হিসেবে স্বীকৃত; এর জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা বৈশ্বিক দায়িত্ব।
২. জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব: হাওর অঞ্চলে ঘন ঘন ও তীব্র প্রাকৃতিক দুর্যোগ (বন্যা, ঢল) ঘটছে, যা জীববৈচিত্র্যের ওপর কেমন প্রভাব ফেলছে তা মূল্যায়ন করা জরুরি।
৩. মানবসৃষ্ট চাপ: পর্যটকের আনাগোনা, প্লাস্টিক দূষণ, ইঞ্জিন চালিত নৌকার ধোঁয়া, ও শিল্প বর্জ্য হাওরের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
৪. ভারী ধাতু দূষণ: হাওরের পানিতে বিপজ্জনক মাত্রায় ভারী ধাতু (heavy metals) শনাক্ত হয়েছে, যা জলজ প্রাণী ও মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে; এর উৎস ও প্রভাব জানা প্রয়োজন।
৫. জীবিকা ও সামাজিক প্রভাব: হাওরের সম্পদ (মাছ, কাঁকড়া) কমে যাওয়ায় স্থানীয় জনগণের (জেলে, কৃষক) জীবিকা ও আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিপন্ন; এই সম্পর্ক বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
৬. সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা: এই সমীক্ষার মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য সংরক্ষণ নীতি (conservation policy) প্রণয়ন, টেকসই ব্যবস্থাপনা (sustainable management) ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করবে।
সমীক্ষার মূল বিষয় (Key Focus Areas):
- বন্যা ও ঢলের কারণে মাছের প্রজনন ও জলজ উদ্ভিদের ক্ষতি।
- প্লাস্টিক ও রাসায়নিক দূষণের ফলে জলজ প্রাণীর ওপর প্রভাব।
- পর্যটকদের কার্যকলাপ (নৌকা, হাউসবোট, বর্জ্য) ও এর পরিবেশগত প্রভাব।
- ভারী ধাতুর উপস্থিতি ও এর বায়ো অ্যাকুমুলেশন (bioaccumulation) প্রক্রিয়া।
- জীববৈচিত্র্যের হ্রাস (মাছ, পাখি, জলজ উদ্ভিদ) এবং স্থানীয় মানুষের জীবিকার ওপর এর প্রভাব।
সুতরাং, টাঙ্গুয়ার হাওরের বিপন্ন জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও এর টেকসই ব্যবস্থাপনার জন্য এই সমীক্ষা অত্যন্ত সময়োপযোগী ও জরুরি।
১.৭ গবেষণার সীমাবদ্ধতা (Research Limitations):
টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র্যের ওপর প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব নিয়ে সমীক্ষায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা ছিল, নিচে তুলে ধরা হলো।
পূর্ববর্তী ডেটা: টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র্য নিয়ে দুর্যোগ-পূর্ববর্তী (Pre-disaster) পর্যাপ্ত ও তুলনামূলক বিস্তারিত ডেটা পাওয়া কঠিন হতে পারে, যা দুর্যোগের প্রভাব মূল্যায়নে বাধা দেয়।
দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা: গবেষণা এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা নাজুক হওয়ায় অনেক জায়গায় পৌঁছানো এবং তথ্য সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়ে। হাওরের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বা দুর্যোগের পরপরই তথ্য সংগ্রহ করা ঝুঁকিপূর্ণ ও সময়সাপেক্ষ, পর্যাপ্ত রাস্তাঘাটের অভাব, ভাড়ায় চালিত মোটর সাইকেল একমাত্র বাহন।
নমুনা সংখ্যার সীমাবদ্ধতা: এই গবেষণায় মাত্র ১০০ জন উত্তরদাতার মতামতের ভিত্তিতে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। যদিও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রতিনিধিতৃমূলক সংখ্যা, তবে অধিক সংখ্যক উত্তরদাতাকে অন্তর্ভুক্ত করলে গবেষণার ফলাফল আরও ব্যাপক ও নির্ভরযোগ্য হতে পারত।
সময় ও আর্থিক সীমাবদ্ধতা: গবেষণা পরিচালনার জন্য বরাদ্দ সময় এবং আর্থিক সামর্থ্য ছিল সীমিত। এর ফলে গবেষণার আওতা বাড়ানো বা দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ সম্ভব হয়নি।
তথ্য সংগ্রহের প্রতিবন্ধকতা: অনেক ক্ষেত্রেই উত্তরদাতারা তাদের প্রকৃত অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে অনিচ্ছুক ছিলেন বা ভয়-লঙ্জার কারণে সীমিত তথ্য দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ অতিরঞ্জিত বা আবেগপ্রবণ তথ্য প্রদান করেছেন, যা উপাত্ত বিশ্লেষণের সময় বিবেচনায় নিতে হয়েছে।
এই সীমাবদ্ধতাগুলো সত্তেও যথাসাধ্য নির্ভুলতা বজায় রেখে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে এবং এবং দীর্ঘ সময় বরাদ্দের মাধ্যমে এই সীমাবদ্ধতাগুলো কাটিয়ে উঠা সম্ভব।
দ্বিতীয় অধ্যায়
তাত্ত্বিক আলোচনা ও সাহিত্য পর্যালোচনা
২.১ হাওরের সংজ্ঞা ও ধরন
হাওর হলো বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এক বিশাল, পিরিচ আকৃতির নিচুভূমি বা জলাভূমি, যা বর্ষাকালে প্লাবিত হয়ে সমুদ্রের মতো দেখায় এবং শীতকালে দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ প্রান্তরে পরিণত হয়। এর প্রধান ধরনগুলি হলো:
- প্রচলিত হাওর: নদীতীরে বন্যা প্রতিরোধের জন্য নির্মিত মাটির বাঁধের মধ্যে অবস্থিত প্রায় গোলাকৃতি নিম্নভূমি বা জলাভূমি।
- বৃহৎ হাওর: এগুলি সাধারণত বৃহত্তর সিলেট ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে দেখা যায়, যা নদী ও খালের মাধ্যমে জলপ্রবাহ পায় এবং বর্ষায় বিস্তৃত ও শীতকালে সংকুচিত হয়ে পড়ে।
- মূল বৈশিষ্ট্য: হাওর হলো একটি বৃহৎ, অগভীর নিম্নচাপ বা জলাভূমি, যা সাধারণত বাটি বা তরকারী আকৃতির হয়।
- বর্ষাকালে: বর্ষাকালে নদী ও খাল থেকে আসা জলধারায় প্লাবিত হয়ে এটি একটি বিস্তীর্ণ, কূলহীন জলাশয়ে পরিণত হয়।
- শীতকালে: শীতকালে যখন বন্যা কমে যায়, তখন হাওর তার জলরাশি হারায় এবং দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ বা সোনালী ধানের ক্ষেতে পরিণত হয়।
হাওরের ধরন
- প্রচলিত হাওর: প্রচলিত অর্থে, এটি একটি প্রাকৃতিক জলাশয় যা বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য নির্মিত বাঁধের মধ্যে আবদ্ধ থাকে।
- বৃহৎ হাওর: এগুলি সাধারণত প্রাকৃতিক ভৌগোলিক অবনমন, যেখানে নদী ও খালের মাধ্যমে জলপ্রবাহ হয় এবং যা বাটি আকৃতির হয়।
২.২ হাওরের জীববৈচিত্র্য বিপর্যয়ের প্রাকৃতিক ও মানব সৃষ্ট কারণ
হাওরের জীববৈচিত্র্য বিপর্যয়ের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন (অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, বন্যা, খরা), অপরিকল্পিত উন্নয়ন (রাস্তা, বাঁধ নির্মাণ), দূষণ (পানির, রাসায়নিক), অতিরিক্ত মৎস্য আহরণ (বিষ ও কারেন্ট জাল ব্যবহার), গাছ কাটা, এবং অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি, যা প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করে মাছ, পাখি ও জলজ উদ্ভিদের আবাসস্থল ও প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস করছে, যা স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকাকেও বিপন্ন করে তুলছে।
প্রাকৃতিক কারণ
জলবায়ু পরিবর্তন: অনিয়মিত ও অসম বৃষ্টিপাত, আকস্মিক বন্যা, খরা, এবং ঘূর্ণিঝড় হাওরের পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ: আগাম ও অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও বন্যায় হাওরের পরিবেশ ও জনজীবন বিপর্যস্ত হয়।
মানবসৃষ্ট কারণ
অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও অবকাঠামো: হাওরের মধ্যে রাস্তা ও বাঁধ নির্মাণে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়, যা জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
দূষণ: কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক, এবং অন্যান্য বর্জ্য পানিতে মিশে পানির গুণাগুণ নষ্ট করে, যা জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদের ক্ষতি করে।
অতিরিক্ত ও ক্ষতিকর মৎস্য আহরণ: বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরা, কারেন্ট জাল ও ছোট ফাঁদের ব্যবহার মাছের ডিম ও রেণু ধ্বংস করে, ফলে মাছের প্রজনন ও বংশবিস্তার মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
গাছ কাটা: হাওর-সংলগ্ন গাছপালা, যেমন হিজল, করচ ইত্যাদি কেটে ফেলায় পাখির আবাসস্থল ও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়।
অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি: হাওর উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর উদাসীনতা, পর্যাপ্ত মনিটরিং এর অভাব, ঠিকাদারদের দুর্নীতি এবং স্থানীয় প্রশাসনের অদক্ষতা/ পানিশমেন্ট পোস্টিং সমস্যার কারণ।
পর্যটনের অব্যবস্থাপনা: অপরিকল্পিত পর্যটন কার্যক্রমও পরিবেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
এই কারণগুলো সম্মিলিতভাবে হাওরের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য, বিশেষত মাছ, পাখি ও জলজ উদ্ভিদের স্বাভাবিক জীবনচক্রকে হুমকির মুখে ফেলছে এবং স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকাকে বিপন্ন করে তুলছে।
২.৩ টাঙ্গুয়ার হাওরের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটঃ
টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ (বন্যা, জলবায়ু পরিবর্তন) এবং মানবসৃষ্ট কারণে (অতিরিক্ত মাছ ধরা, বন ধ্বংস, পর্যটনের চাপ) মারাত্মক হুমকির মুখে; ফলে মাছ, পাখি ও অন্যান্য জলজ সম্পদের ব্যাপক হ্রাস পাচ্ছে, যা স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকাকে বিপর্যস্ত করছে, যদিও প্রশাসন ও স্থানীয়দের পক্ষ থেকে সুরক্ষার জন্য নানা উদ্যোগ (যেমন হাউসবোট নিষিদ্ধকরণ, নদী খনন) নেওয়া হচ্ছে । ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে, এটি ছিল সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের ভান্ডার, যা এখন বিপন্ন এবং এর ঐতিহ্য ও বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধারে জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন।
টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব:
- মাছ ও জলজ প্রাণীর হ্রাস: আকস্মিক বন্যা ও পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা মাছের প্রজনন ও আবাসস্থল নষ্ট করছে, ফলে মাছের উৎপাদন কমেছে।
- পাখির আবাসস্থল ধ্বংস: জলবায়ু পরিবর্তন ও মানুষের অত্যাধিক আনাগোনা, শিকার এবং বনজ সম্পদ ধ্বংসের কারণে পরিযায়ী ও স্থানীয় পাখির সংখ্যা কমে যাচ্ছে, যা হাওরের অন্যতম আকর্ষণ।
- হিজল-করচ বনের ক্ষতি: বন্যা ও মানুষের অসচেতনতায় এই গুরুত্বপূর্ণ বনজ সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা পাখি ও মাছের আশ্রয়স্থল।
- কৃষির ওপর প্রভাব: অকাল বন্যা ও দুর্যোগে বিস্তীর্ণ হাওরের কৃষিজমি, বিশেষত বোরো ধান, ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা কৃষকের জীবন-জীবিকা ও খাদ্য নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলে।
- জীবিকার সংকট: প্রাকৃতিক সম্পদ কমে যাওয়ায় জেলে ও স্থানীয় মানুষের ঐতিহ্যবাহী পেশা হুমকির মুখে পড়েছে।
- ঐতিহ্যবাহী জলাভূমি: টাঙ্গুয়ার হাওর (যা ‘শহিদ স্মৃতি হাওর’ নামেও পরিচিত) ছিল বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম ও সমৃদ্ধ মিঠা পানির জলাভূমি, যা জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত।
- জীববৈচিত্র্যের ভান্ডার: একসময় এখানে প্রচুর মাছ, অসংখ্য দেশি-বিদেশি পাখি এবং হিজল-করচের মনোমুগ্ধকর বন ছিল, যা হাওরকে এক অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের রূপ দিত।
- বিপন্নতা: সময়ের সাথে সাথে পরিবেশ দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও মানুষের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
২.৪ টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশগত পরিবর্তন
টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশগত পরিবর্তনগুলি মূলত অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন, প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। এই কারণগুলি হাওরের জীববৈচিত্র্য, মৎস্য সম্পদ এবং স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করেছে।
প্রধান পরিবেশগত পরিবর্তন এবং কারণসমূহ
প্লাস্টিক ও বর্জ্য দূষণ: বর্যাকালে প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটকের আগমনের ফলে টনকে টন প্লাস্টিক বর্জ্য (যেমন পানির বোতল, চিপসের প্যাকেট) হাওরের পানিতে জমছে, যা জীববৈচিত্র্যের জন্য ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
পানিতে ভারী ধাতুর বিপজ্জনক উপস্থিতি: সাম্প্রতিক এক গবেষণায় হাওরের পানিতে বিপজ্জনক মাত্রায় ছয় ধরনের ভারী ধাতু পাওয়া গেছে। পর্যটন, কৃষিকাজ এবং সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে আসা শিল্পবর্জ্য এই দূষণের মূল উৎস বলে মনে করা হচ্ছে।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরসহ আশেপাশের এলাকায় পানিতে ছয়টি ভারী ধাতুর (আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, কপার, লেড এবং জিঙ্ক) বিপজ্জনক উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
গবেষণার মূল তথ্যের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
- বিপজ্জনক ধাতুসমূহ: পানিতে আর্সেনিক, সীসা (Lead) এবং ক্যাডমিয়ামের মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি পাওয়া গেছে।
- স্বাস্থ্যের ঝুঁকি: এই দূষিত পানি দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহারের ফলে স্থানীয় মানুষের ক্যান্সার, ত্বকের রোগ এবং কিডনি জটিলতার ঝুঁকি বাড়ছে।
- উৎসবের কারণ: মূলত উজানের পাহাড় থেকে আসা ঢল, কয়লা ও পাথর খনির বর্জ্য এবং কৃষিকাজে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার ও কীটনাশককে এই দূষণের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
- খাদ্যচক্র: গবেষণায় দেখা গেছে, এই ভারী ধাতুগুলো মাছের মাধ্যমে মানুষের খাদ্যচক্রেও প্রবেশ করছে, যা পুরো অঞ্চলের জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ।
অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন এবং হাউসবোটের প্রভাব:
হাওরের অভ্যন্তরে অবাধে প্রায় আড়াই শতাধিক ইঞ্জিনচালিত নৌকা ও বিলাসবহুল হাউসবোট চলাচল করছে।নৌকার উচ্চ শব্দ এবং সার্চলাইটের আলো পাখি ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক জীবনচক্রে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। ব্যবহৃত পানি, মলমূত্র, এবং মবিল সরাসরি হাওরের বদ্ধ পানিতে ফেলা হচ্ছে, যা পানিকে দূষিত করছে।
হিজল-করচ বনের অবক্ষয়: ওয়াচ টাওয়ার এলাকার আশেপাশে নৌকা বাঁধার কারণে হিজল ও করচ গাছের ডালপালা ভেঙে যাচ্ছে এবং গাছগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জ্বালানির জন্য গাছ কাটাও একটি কারণ।
মাছের সংখ্যা হ্রাস: অবাধে মাছ শিকার এবং নিষিদ্ধ জাল ব্যবহারের কারণে অনেক মাছের প্রজাতি বিলুপ্ত বা কমে যাচ্ছে। মাছের প্রজনন ক্ষেত্র বিনষ্ট হওয়ায় মৎস্যজীবীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব:
অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, এবং উজান থেকে নেমে আসা আকস্মিক বন্যা (Flash Flood) হাওরের বাস্তুতন্ত্রকে প্রভাবিত করছে। এতে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং স্থানীয়দের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়ছে। এই পরিবেশগত অবক্ষয় ঠেকাতে সরকার ও বিভিন্ন সংস্থা পদক্ষেপ নিচ্ছে। এর মধ্যে হাউসবোট প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) যৌথ ব্যবস্থাপনায় একটি পাঁচ বছর মেয়াদি সংরক্ষণ প্রকল্প অন্যতম।
২.৫ হাওরে দুর্যোগের সময়কাল, কারণ ও মোকাবেলায় স্থানীয়দের পদক্ষেপ
সাম্প্রতিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দুর্যোগের এই সময়সূচি কিছুটা বদলে যাচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে মার্চের শেষভাগেই আগাম বন্যার ঝুঁকি দেখা দিচ্ছে। হাওর অঞ্চলে মূলত এপ্রিল (চৈত্র-বৈশাখ) মাসে দুর্যোগের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি থাকে। এই সময়ে ভারতের মেঘালয় ও আসামের পাহাড়ি ঢলে হঠাৎ আসা আকস্মিক বন্যা বা ফ্ল্যাশ ফ্লাড হাওরের প্রধান দুর্যোগ হিসেবে পরিচিত
নিচে মাসভিত্তিক প্রধান দুর্যোগগুলোর বিবরণ দেওয়া হলো:
- এপ্রিল (প্রধান দুর্যোগের মাস): এই মাসে উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে আকস্মিক বন্যা হয়, যা হাওরের প্রধান ফসল বোরো ধান পুরোপুরি তলিয়ে দেয়। এছাড়া তীব্র কালবৈশাখী ঝড়, বজ্রপাত এবং শিলাবৃষ্টি এই মাসেই বেশি দেখা যায়
- মার্চ (আগাম দুর্যোগ): জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ইদানীং মার্চের শেষভাগেও আকস্মিক বন্যা শুরু হতে দেখা যাচ্ছে (যেমন ২০১৭ ও ২০২২ সালে), যা স্থানীয় কৃষকদের অপ্রস্তুত অবস্থায় বিপদে ফেলে দেয়।
- মে: এই মাসে দুর্যোগের ধরণ কিছুটা পরিবর্তিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় এবং অতিবৃষ্টির রূপ নেয়, যা হাওরের প্লাবনকে আরও দীর্ঘায়িত করে।
- জুন-আগস্ট (বর্ষাকাল): এই সময়ে নিয়মিত মৌসুমি বন্যা হয়। তবে এটি আকস্মিক বন্যার মতো অতটা ধ্বংসাত্মক না হলেও ঢেউয়ের আঘাতে (আফাল) হাওর তীরের গ্রামগুলোতে ভূমি ক্ষয়ের সৃষ্টি করে।
দুর্যোগের মূল কারণসমূহ:
১. পাহাড়ি ঢল: ভারতের চেরাপুঞ্জি ও সংলগ্ন পাহাড়ের অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত সরাসরি সুরমা, কুশিয়ারা ও ধনু নদীতে চলে আসে।
২. বজ্রপাত: খোলা মাঠ কোথাও আশ্রয় নেওয়ার কোন স্থাপনা না থাকায় ও পানির আধিক্য থাকায় হাওর এলাকায় বজ্রপাতে প্রাণহানির হার অনেক বেশি।
৩. আফাল (উচ্চ তরঙ্গ): বর্ষাকালে বিশাল জলরাশির ওপর বাতাসের বেগে যে বড় বড় ঢেউ তৈরি হয়, তা ঘরবাড়ি ও পাড় ভেঙে দেয়।
দুর্যোগ মোকাবেলায় স্থানীদের পদক্ষেপ
হাওর অঞ্চলের মানুষ যুগ যুগ ধরে প্রকৃতির সাথে লড়াই করে টিকে থাকার জন্য নিজস্ব কিছু টেকসই ও কার্যকর কৌশল উদ্ভাবন করেছে। বিশেষ করে আকস্মিক বন্যা (Flash Flood) এবং আফাল (বড় ঢেউ) মোকাবিলায় তাদের নেওয়া পদক্ষেপগুলো বেশ অনন্য:
১. আফাল মোকাবিলায় ‘করচ’ ও ‘বাঁশ’ দিয়ে দেয়াল (Bio-fencing)
বর্ষাকালে বিশাল জলরাশির ঢেউ বা আফাল থেকে বাড়িঘর বাঁচাতে স্থানীয়রা প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো করচ গাছ দিয়ে গ্রামের চারপাশে বেষ্টনী তৈরি করে। এছাড়া:
- বাড়ির চারপাশে বাঁশের খাঁচা তৈরি করে তাতে কচুরিপানা বা ঘাস দিয়ে এক ধরণের জীবন্ত দেয়াল তৈরি করা হয়, যা ঢেউয়ের শক্তি কমিয়ে দেয়।
- একে স্থানীয় ভাষায় ‘ঢল নামানো’ বা ‘ঢেউ আটকানো’ বলা হয়।
২. ভিটি উঁচু করা ও সুরক্ষা (Plinth Raising)
বন্যায় ঘর যেন তলিয়ে না যায়, সেজন্য স্থানীয়রা তাদের বাড়ির ভিটি (Plinth) অনেক উঁচু করে তৈরি করে।
- ভিটির মাটি যেন ঢেউয়ে ধুয়ে না যায়, সেজন্য তারা বাড়ির ঢালে পাথর, সিমেন্টের ব্লক বা শক্ত ঘাস (যেমন- ছন বা বিন্না ঘাস) রোপণ করে।
৩. ফসল রক্ষায় ‘কান্দার’ ও ‘বাঁধ’ ব্যবস্থাপনা
হাওরে ফসল রক্ষার জন্য স্থানীয়রা সম্মিলিতভাবে ‘ডুবন্ত বাঁধ’ (Submersible Embankment) মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ করে।
- ধান পাকার ঠিক আগমুহূর্তে পাহাড়ি ঢল আসার উপক্রম হলে গ্রামবাসী স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে বাঁধ পাহারা দেয় এবং ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দ্রুত মেরামত করে। একে অনেক সময় ‘বাঁধ বাঁধানো’ উৎসবের মতো দেখা হয়।
৪. শস্যের বৈচিত্র্য ও আগাম চাষ
ক্ষতি এড়াতে বর্তমানে স্থানীয়রা দীর্ঘমেয়াদী ধানের বদলে স্বল্পমেয়াদী (Short-duration) এবং বন্যা-সহিষ্ণু জাতের ধান চাষে বেশি ঝুঁকছে।
- তারা চেষ্টা করে যেন এপ্রিলের শেষ সপ্তাহের (বৈশাখী ঢল) আগেই ধান কেটে ঘরে তোলা যায়।
৫. গবাদি পশু ও বীজ সংরক্ষণ
বন্যার সময় গবাদি পশুর খাদ্য সংকট মেটাতে তারা আগেভাগেই খড় শুকিয়ে উঁচু মাচায় বা ‘পুঞ্জি’ করে রাখে। এছাড়া শস্যের বীজ নিরাপদ রাখতে মাটির বড় বড় মটকা বা প্লাস্টিকের ড্রাম ব্যবহার করে তা ঘরের ছাদের কাছাকাছি ঝুলিয়ে রাখা হয়।
৬. সামাজিক সতর্কতা ও যোগাযোগ
আকস্মিক বন্যার খবর আদান-প্রদানের জন্য স্থানীয়রা মসজিদের মাইক ব্যবহার করে বা ঢোল পিটিয়ে সবাইকে সতর্ক করে। বর্তমানে মোবাইল ফোন ও রেডিওর মাধ্যমে উজানের বৃষ্টির খবর নিয়ে তারা দ্রুত ফসল কাটার সিদ্ধান্ত নেয়।
২.৬ সাহিত্য পর্যালোচনা
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বদলে যাচ্ছে হাওড়ের জীবন
মোহাম্মদ মজিবুর রহমান ২৩ আগস্ট, ২০২১
সিনিয়র শিক্ষক

দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি জেলার প্রায় সাড়ে আট লাখ হেক্টরজুড়ে গঠিত বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল। প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এসব হাওর জীববৈচিত্র্যের আধার। হাওরের ভূপ্রকৃতিগত গঠন জলজ উদ্ভিদ, মাছ আর পশুপাখির জন্য নিরাপদ চারণক্ষেত্র হিসেবেই বিবেচিত হয়ে আসছে দীর্ঘকাল থেকে। সাম্প্রতিক সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ও আমাদের পরিবেশ বিধ্বংসী কার্যক্রমের কারণে প্রকৃতি ও পরিবেশ হারাচ্ছে স্বাভাবিক ভারসাম্য। কখনও এই প্রকৃতি ধারণ করছে রুদ্র রূপ। এতে বিনষ্ট হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। হচ্ছে ফসলহানি। এমনকি প্রাণহানিও। ফলে হাওরবাসীর জীবন ও জীবিকা আজ চরম হুমকির মুখে। আয়-উপার্জন না থাকায় হাওরের মানুষ জীবিকার খুঁজে হচ্ছে শহরমুখী। এতে শহরের ওপর বাড়ছে বাড়তি চাপ। পরিবেশের এই বিপর্যয়ের প্রভাবে সুখ বিনষ্ট হচ্ছে গ্রাম, শহর পেরিয়ে ভিনদেশেও।
হাওরের পরিবেশ ও প্রতিবেশ অনেকটা নাজুক। হাওর বছরে প্রায় ছয় মাস থাকে বিশাল সমুদ্রের মতো। গ্রামগুলো হয়ে ওঠে ছোট ছোট দ্বীপ। বাকি ছয় মাস এই বিস্তীর্ণ জলরাশি আর দেখা যায় না। হয়ে ওঠে সবুজ শস্যক্ষেত বা মাঠ। প্রাণী বা উদ্ভিদ বৈচিত্র্য হাওরের অনন্য বৈশিষ্ট্য। হাওর উন্নয়ন মহাপরিকল্পনার তথ্য অনুযায়ী, হাওরে ২৫৭ প্রজাতির পাখি, ৪০ প্রজাতির সরীসৃপ, ২৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী ও ৯ প্রজাতির উভচর রয়েছে। এ ছাড়াও হাওরে বিভিন্ন প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ ও গুল্মলতা রয়েছে। এসব প্রজাতির অনেকই বিপন্ন প্রজাতির। এসব প্রজাতিকে রক্ষা করতে হলে হাওরের পরিবেশ সুরক্ষা করতে হবে।
হাওরের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় জনসচেতনতা জরুরি, দৈনিক ইত্তেফাক
প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০২১
হাওর গ্রামবাংলার মানুষের কাছে এক নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি। তবে হাওরের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য দিন দিন হুমকির মুখে পড়ছে। অমৎস্যজীবীরা প্রায়ই বিল সেচে বিষ দিয়ে মাছ ধরছে। ফলে মাছের বংশবিস্তার ও খাদ্যশৃঙ্খল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। হাওরে মানুষ সাধারণত ছোট খুনা জাল দিয়ে মাছ ধরে থাকে। এই খুনা জালে মাছের ডিমও ধরা পড়ে। এভাবে ডিম নষ্ট হয়ে যাওয়ায় মাছের প্রজননের হার অনেক কমে যায়। অন্যদিকে কারেন্ট জালও মাছের প্রজনন হার কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। হাওরে শত শত হ্যাজাক লাইট হাওরের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর। বর্তমানে হ্যাজাক লাইটের কারণে হাওরে পরিযায়ী পাখির সংখ্যা অনেক কমে এসেছে। হাওর তীরবর্তী ঢেউয়ের আঘাতের হাত থেকে বাড়িঘর রক্ষা করতে প্রতিরোধ দেওয়াল তৈরি বাবদ প্রচুর বনের গাছ ও লতাগুল্ম কাটা হচ্ছে। তাছাড়া জ্বালানি, গৃহস্থালি ও পরিবারের অন্যান্য কাজের জন্য কাটা হচ্ছে প্রচুর গাছ। এতে করে হাওরের পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হচ্ছে, পাশাপাশি বিনষ্ট হচ্ছে উদ্ভিদ প্রজাতিও। অন্যদিকে লঞ্চ ও ট্রলারের ইঞ্জিনের শব্দ, কালো ধোঁয়া ও তেলের কারণেও হাওরের পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। হাওর বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র উপায়। সেজন্য হাওরের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সবার সচেতন হতে হবে।
মো. আশরাফুল ইসলাম
শাহবাগ, তাড়াইল, কিশোরগঞ্জ
টাঙ্গুয়ার হাওর: বিপন্ন প্রাকৃতিক সম্পদ ও আমাদের দায়িত্ব
আসাদুজ্জামান সম্রাট প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২৫
অপরূপ সৌন্দর্য্যে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব সীমান্তবর্তী এলাকার এক রত্নসদৃশ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য হলো টাঙ্গুয়ার হাওর। এটি শুধু জলজ জীববৈচিত্র্যের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং এই অঞ্চলের মানুষের জীবন ও সংস্কৃতির অঙ্গনেও গভীর প্রভাব ফেলে। রামসার সাইট হিসেবে স্বীকৃত এই হাওর একসময় ছিল অগণিত পাখি, মাছ ও জলজ উদ্ভিদের আশ্রয়স্থল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলিতে পর্যটনের অপ্রতিরোধ্য থাবা এবং মানুষের কার্যক্রমের কারণে হাওরের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। টাঙ্গুয়ার হাওরের সৌন্দর্য্য কেবল পানি ও গাছপালায় সীমাবদ্ধ নয়। এখানে রয়েছে অসংখ্য আকর্ষণীয় ভ্রমণকেন্দ্র। মেঘালয়ের পাহাড় আর নীল জলরাশির মাঝে মাথা উঁচু করে দাড়িয়ে রয়েছে বারিক্কা টিলা। এখানে একটি সীমানা পিলারে চার পাশে ঘুরলেই বাংলাদেশ ও ভারত ভ্রমণ হয়ে যায় ভিসা ছাড়াই। এখান থেকে যাদুকাটা নদী পাড় হয়ে মেঘালয়ের সবুজ পাহাড়গুলো এক অপূর্ব মায়াময় দৃশ্যের অবতারণা করে। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখা টেকেরঘাট যেমন ইতিহাসের অংশ তেমনি এর পাশেই চুনাপাথরের লেক যা নীলাদ্রী লেক কিংবা শহীদ সিরাজ লেকের স্বচ্ছ নীল জলের জন্য পরিচিত। এখানের উচু টিলার এক পাশে ভারতীয় পাহাড়, অন্য পাশে হাওর। তারই মাঝে এই লেকে কায়াকিং ছাড়াও এর শীতল পানিতে গোসল করার এক ভিন্ন আমেজের সৃষ্টি করে। ভারতের মেঘালয়ের পাহাড় থেকে প্রবাহিত যাদুকাটা নদী নদী ভ্রমণ প্রেমীদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা। নদীর পানি এবং দুই পাশে ছড়িয়ে থাকা সবুজ গাছপালা এক অসাধারণ প্রাকৃতিক দৃশ্য উপহার দেয়। বিশেষ করে সূর্যাস্তের সঙ্গে আকাশ ও হাওরের মিলনের মোহময়তা ছাড়িয়ে যায় জীবনের সকল রঙকে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য ছাড়াও শিমুল বাগান এবং লাকমাছড়া ঝর্ণা পর্যটকদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ। শিমুল বাগানের লাল ফুলগুলো বসন্তের সময় হাওরের সবুজের সঙ্গে চমৎকার সমন্বয় ঘটালেও সে হাওরে পানি থাকে না, পর্যটকরাও খুব একটা আসেনা। পর্যটন মৌসুমে সমুজ শিমুল বাগাও পর্যটকদের আকর্ষণ করে।
লাকমাছড়া ঝর্ণার শান্ত ও পরিস্কার জলপাতে অনেকেই ভ্রমণ ও ছবি তোলার জন্য ভিড় করেন। হাওরের মাঝখানে নির্মিত ওয়াচ টাওয়ার থেকে পুরো হাওরের বিস্তীর্ণ দৃশ্য চোখে পড়ে, যেখানে হাওরের জল, টিলা, নদী এবং সবুজ গাছপালার এক অপূর্ব মিলন দেখা যায়। এই জায়গা থেকে পাখি পর্যবেক্ষণও করা যায়, বিশেষ করে শীতকালে যখন হাওরে হাজার হাজার পরিযায়ী পাখি ভিড় করে। টাওয়ারের স্থায়িত্ব রক্ষায় স্থানীয় প্রশাসন লাল পতাকা টানিয়ে সীমানা দিয়েছে। যাতে ওই এলাকায় হাউসবোটগুলো প্রবেশ করতে না পারে। ফলে হাউসবোট থেকে পর্যটকদের টাওয়ারে নিয়ে যেতে ছোট ছোট ডিঙি নৌকা আসে। একে কর্মরত বিশাল সংখ্যক জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে।
টাঙুয়ার হাওরের নীলাদ্রি লেকের সৌন্দর্য উপভোগ করছেন লেখক:
টাঙ্গুয়ার হাওরের সৌন্দর্য্য স্বচ্ছ জল, সুনিপুণভাবে ছড়িয়ে থাকা জলজ গাছপালা, এবং হাজার হাজার পাখির আনাগোনা দেখে যে কেউ বিমোহিত হতে বাধ্য। হাওরের সবুজ জলজ উদ্ভিদ যেমন হিজল, করচ, এবং অন্যান্য জলজ গাছপালা একসময় সমৃদ্ধি এবং স্থিতিশীলতা বয়ে আনত। এরা মাটি আঁকড়ে ধরে হাওরের বাঁধ ও তটরক্ষা করত, পাশাপাশি মাছ ও কাঁকড়া প্রজাতির জন্য আশ্রয়স্থল হিসেবেও কাজ করত। তবে বর্তমানে পর্যটনের বিস্তার ও হাউসবোটের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এই প্রাকৃতিক ভারসাম্য ভেঙে যাচ্ছে। পর্যটকরা টাঙ্গুয়ার হাওরের নান্দনিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে হাউসবোটে ভ্রমণ করেন। এই হাউসবোটের সংখ্যা বর্তমানে কয়েকশ’র উপর, যা হাওরের পানি ও তটের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। ইঞ্জিনচালিত নৌকার শব্দ ও তেলজাত পদার্থের কারণে পানিতে দূষণ ছড়িয়ে পড়ছে, যা মাছের প্রজনন হ্রাস করছে। স্থানীয় এবং পরিযায়ী পাখির অভ্যন্তরীণ বাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক প্রজাতি হাওর ত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছে। রাতের বেলায় হাউসবোটের লাইট এবং লাউডস্পিকার শব্দে প্রাণীদের স্বাভাবিক জীবনচক্র বিপর্যস্ত হচ্ছে। এই সমস্যা শুধু প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্যের ওপরই সীমাবদ্ধ নয়। হাওরের পরিবেশগত ক্ষতি সরাসরি স্থানীয় মানুষের জীবিকার ওপর প্রভাব ফেলছে। মাছ, কাঁকড়া, হিজল ও করচের মতো প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল এখানকার মানুষদের জীবিকা হুমকির মুখে। অল্প বয়সী ছেলেমেয়েরা এবং নারী-পুরুষেরা হাওরের মাছ ধরার কাজে নিয়োজিত থাকলেও বর্তমান সময়ে মাছের সংখ্যা হ্রাস পাওয়ায় তাদের আয়ও কমে যাচ্ছে। ফলে সমাজের আর্থ-সামাজিক অবস্থাও প্রভাবিত হচ্ছে। পর্যটকরা টাঙ্গুয়ার হাওরের স্বপ্নময় দৃশ্য উপভোগ করতে আসলেও অতিরিক্ত ভ্রমণ ও হাউসবোটের চাপ হাওরের পরিবেশকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। হাজার হাজার পর্যটক এসে হাওরের তীরে প্লাস্টিক, খাদ্যের অবশিষ্টাংশ, এবং অন্যান্য আবর্জনা ফেলে যাচ্ছেন। এ ধরনের দূষণ শুধুমাত্র পানির গুণগতমান কমাচ্ছে না, বরং মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর মৃত্যুও বাড়াচ্ছে। এছাড়াও হাওরের তটরেখায় হিজল, করচ ও অন্যান্য জলজ উদ্ভিদ চারণের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। হাওরের ভ্রমণস্থলগুলোও অত্যন্ত আকর্ষণীয়। নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জের বিভিন্ন নৌপথ ধরে ভ্রমণ করলে দেখা যায়, পানি-জঙ্গল ও সবুজ প্রাকৃতিক দৃশ্যের অপূর্ব সংমিশ্রণ। হাওরের মধ্য দিয়ে নৌকাভ্রমণে অতিথিরা ঝর্ণা, হ্রদ এবং ছোট ছোট দ্বীপের সৌন্দর্য দেখতে পান। এই ভ্রমণকেন্দ্রগুলোতে পাখি পর্যবেক্ষণ ও মাছ ধরা যেমন জনপ্রিয়, তেমনি ফটোগ্রাফির জন্যও এটি স্বর্গসদৃশ। তবে এই সৌন্দর্য্য রক্ষা করতে না পারলে ভ্রমণও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
প্রতি বছর এখানে দেশি ও বিদেশি হাজার হাজার পরিযায়ী পাখি আসে। বসন্ত ও শীতকালে হাওরের পাখি ও জলজ প্রাণী হাওরের জলজ গাছপালা ও প্রাকৃতিক আশ্রয়ে আশ্রয় নেয়। এই প্রাকৃতিক চক্র বর্তমানে ভঙ্গুর। হাওরের জলজ উদ্ভিদের হ্রাস ও পর্যটনজনিত চাপের কারণে পাখির সংখ্যা দিনদিন কমছে। এ সমস্যার দ্রুত সমাধান না হলে টাঙ্গুয়ার হাওর অচিরেই পৃথিবীর মানচিত্রে প্রাকৃতিক নিঃসৃতির জন্য এক বিপন্ন অঞ্চলের রূপ নিতে পারে।
এপাড়ে বাংলাদেশ, মাঝখানে যাদুকাটা নদী পেরিয়ে মেঘালয়ের পাহাড়ের অপরূপ সৌন্দর্য্যে।টাঙ্গুয়ার হাওরের প্রাণ ও প্রকৃতি রক্ষায় সরকারি উদ্যোগ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় হাওরের সংরক্ষণের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। হাওরের একাংশে হাউসবোটের সংখ্যা সীমিত করা, মাছ ধরার নিয়মকানুন কঠোর করা, এবং জলজ উদ্ভিদ পুনঃরোপণ কর্মসূচি শুরু হয়েছে। পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা ও স্থানীয় জনগণও সচেতনতা বৃদ্ধির চেষ্টা করছেন। শিক্ষামূলক প্রচারণা, হাওর সংরক্ষণে কমিউনিটি প্রজেক্ট, এবং পর্যটকদের সচেতন করার জন্য বন্দর ও ট্যুর গাইডদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তবে এই প্রতিবেশগত সংকটের সমাধান এখনও চ্যালেঞ্জিং। হাওরের চারপাশের নগরায়ন ও মানুষদের জীবনযাত্রার পরিবর্তন হাওরের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। তাই প্রয়োজন স্থানীয় জনগণকে সহায়তা করে টেকসই পদ্ধতিতে হাওরের ব্যবহারের নিয়মকানুন প্রতিষ্ঠা করা। এছাড়াও হাওরের বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করতে সরকারকে আরও কঠোর নীতি গ্রহণ করতে হবে।
পর্যটকরা হাওরের সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে আসলে তাদের আচরণেও পরিবর্তন আনা জরুরি। প্লাস্টিক এবং অন্যান্য দূষণযোগ্য পদার্থ ফেলা থেকে বিরত থাকা, নির্ধারিত নৌকাপথ ব্যবহার করা, এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতা করা যেমন প্রয়োজন, তেমনি হাওরের জীববৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া অপরিহার্য। এই ছোট্ট পদক্ষেপগুলো মিলিয়ে মিলিয়ে হাওরের দীর্ঘমেয়াদী সংরক্ষণে বড় ভূমিকা রাখবে। টাঙ্গুয়ার হাওরের সৌন্দর্য্য, প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য এবং ভ্রমণ আকর্ষণগুলো একসাথে বিবেচনা করলে দেখা যায়, এটি শুধু বাংলাদেশের জন্যই নয়, সমগ্র বিশ্বের জন্য মূল্যবান একটি জলজ সম্পদ। যদি হাওরের ক্ষয় ও দূষণ অব্যাহত থাকে, তবে একটি সুন্দর ভ্রমণকেন্দ্র এবং জীববৈচিত্র্যের রূপকথার জগৎ হারিয়ে যাবে। এই মুহূর্তে আমাদের দায়িত্ব হলো সচেতনতা সৃষ্টি করা। স্কুল, কলেজ, এবং সামাজিক মাধ্যমে হাওরের গুরুত্ব ও সমস্যার বিষয়ে শিক্ষামূলক প্রচারণা চালানো যেতে পারে। স্থানীয় জনসাধারণের সঙ্গে মিলে হাওরের জলজ উদ্ভিদ পুনঃরোপণ, মাছ সংরক্ষণ এবং পর্যটন ব্যবস্থাপনা করা যেতে পারে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও পর্যটন ব্যবসায়ীদেরও এই প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করা উচিত। এতো সবের পরেও টাঙ্গুয়ার হাওরের সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা আমাদের সকলের দায়িত্ব। যদি আমরা আজ সচেতন না হই, তবে আগামী প্রজন্ম এই প্রাকৃতিক ধন-সম্পদকে কেবল বই ও ছবিতে দেখবে। হাওরের নীল জল, সবুজ জলজ উদ্ভিদ, সাদা পাখি, এবং নৌকাভ্রমণের আনন্দ হারিয়ে যাবে। কিন্তু যদি আমরা সকলে মিলে সংরক্ষণে উদ্যোগ নিই, তাহলে টাঙ্গুয়ার হাওর এক অভিন্ন সৌন্দর্য্যের ও জীববৈচিত্র্যের প্রতীক হয়ে থাকবে। এটি শুধু বাংলাদেশের নয়, পুরো বিশ্বকেই শিক্ষা দেবে যে প্রকৃতি এবং মানুষের সহাবস্থান সম্ভব। টাঙ্গুয়ার হাওর আমাদের স্বপ্নময় প্রাকৃতিক সম্পদ। এটি রক্ষা করতে হলে সরকারের, বেসরকারি সংস্থা, স্থানীয় জনগণ এবং পর্যটকদের সম্মিলিত প্রয়াস প্রয়োজন। শুধুমাত্র তখনই আমরা এই জলের জগৎ, পাখি ও মাছের স্বর্গ, এবং সবুজ গাছের সমৃদ্ধ হাওরকে আগামী প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করতে পারব। হাওরের প্রতিটি তরঙ্গ, প্রতিটি পাখির উড়ান, এবং প্রতিটি হিজল বা করচের শেকড় আমাদের সতর্কবার্তা দিচ্ছে। “আমাকে রক্ষা করো, আমি তোমাদের জীবনও রক্ষা করব।” পর্যটন হোক আনন্দময়, জীবন হোক স্থিতিশীল, এবং প্রকৃতি অটুট থাকুক-এটাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত। টাঙ্গুয়ার হাওরের নীল জল আর সবুজ গাছপালার মাঝে এই সতর্কবার্তা যেন প্রতিদিন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির সঙ্গে সমন্বয় ছাড়া কোনো উন্নয়ন স্থায়ী নয়।
আসাদুজ্জামান সম্রাট, নির্বাহী সভাপতি, সাউথ এশিয়ান ক্লাইমেট চেইঞ্জ জার্নালিস্ট ফোরাম (সাকজেএফ)
টাঙ্গুয়ার হাওর
‘আগে মাছের অভাব ছিল না, এখন চাষের পাঙাশ কিনে খাই’
মোছাব্বের হোসেন ও খলিল রহমান
টাঙ্গুয়ার হাওর থেকে ফিরে, ১২ জুন ২০২৫
বাংলাদেশের দ্বিতীয় রামসার সাইট, সম্পদ আর সৌন্দর্যে ভরপুর টাঙ্গুয়ার হাওরের চিত্র আজ করুণ। ইজারাপ্রথা বাতিলের পর গত ২২ বছরে হাওরের উন্নয়নে বহু চেষ্টা করা হলেও তেমন কোনো ইতিবাচক ফল আসেনি; বরং হাওরপারের মানুষের জীবন-জীবিকা, পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্য এখন গভীর সংকটের মুখে। কার্যত প্রশাসনের নজরদারির অভাবে যে যেভাবে পারছে, এই হাওরের ক্ষতি করছে।
হাওরে প্রবেশের মুখেই চোখে পড়বে সারি সারি শতাধিক বোটহাউস। বিকট শব্দে জেনারেটর চলছে, আর যত্রতত্র ফেলা হচ্ছে পলিথিনসহ নানা বর্জ্য। যে অভয়ারণ্যে ট্রলারচালিত নৌকা ঢোকাই নিষেধ, সেখানে অবাধে চলছে এসব কর্মকাণ্ড। এই হাওরে একসময় গড়ে দুই লাখ পাখির আনাগোনা ছিল, এবার পরিযায়ী পাখিও এসেছে ইতিহাসের সর্বনিম্ন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সুন্দরবনের পর জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ জলাভূমি হিসেবে ঘোষিত টাঙ্গুয়ার হাওর রামসার ঘোষণার পরও সুরক্ষিত ব্যবস্থাপনার অভাবে আজ অভিভাবকহীন। সবাই মিলে ‘যেমন খুশি তেমন ধ্বংস’ করছে।
অস্তিত্বসংকটে টাঙ্গুয়ার হাওর
দীর্ঘ ৭০ বছর জলমহালে প্রচলিত ইজারাপ্রথার অধীনে ছিল টাঙ্গুয়ার হাওর। ইজারা বাতিলের পর থেকে এটি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে আসে। উদ্দেশ্য ছিল হাওরের সম্পদ রক্ষা, সংরক্ষণ এবং হাওরপারের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন। তবে সরকারি-বেসরকারি কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রশাসন ও প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে তেমন সাফল্য আসেনি। মাছ, গাছ, পাখিসহ জীববৈচিত্র্যের আধার, বিশেষ করে মিঠাপানির মাছের জন্য বিখ্যাত এই হাওরে অবাধ আহরণের কারণে মাছ কমছে। হাওর ভরাট, বন ও আবাসস্থল ধ্বংস, মানুষের উৎপাত ও শিকারের ফলে কমছে পাখির সংখ্যা। পর্যটকদের অবাধ বিচরণও হাওরের পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
টাঙ্গুয়ার হাওরের অবস্থান সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর ও মধ্যনগর উপজেলায়। জেলা শহর থেকে দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার। চারটি ইউনিয়নের ১৮টি মৌজাজুড়ে টাঙ্গুয়ার হাওরের আয়তন ১২ হাজার ৬৫৫ হেক্টর। হাওরে ছোট-বড় বিল আছে ৫৪টি। ভেতরে জালের মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অসংখ্য খাল। বর্ষায় সব পানিতে একাকার হয়ে যায়। তখন হাওর রূপ নেয় ‘সায়র বা সাগরে’। টাঙ্গুয়ার এলাকার ভেতরে ও তীরে রয়েছে ৮৮টি গ্রাম। এসব গ্রামের প্রায় ৬০ হাজার মানুষের জীবন-জীবিকা হাওরের ওপর নির্ভরশীল।
ইজারাপ্রথা বাতিলের পর কিছুদিনের জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পুলিশ ও আনসার সদস্যদের পাহারা ছিল, সঙ্গে ছিলেন কমিউনিটি গার্ডের সদস্যরাও। তবে বর্তমানে বিশাল হাওরের পাহারায় আছেন মাত্র ১৬ জন আনসার সদস্য। হাওর উন্নয়ন বা ব্যবস্থাপনায় এখন কোনো কার্যকর প্রকল্প নেই। এই অবস্থায় বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ টাঙ্গুয়ার হাওরকে রক্ষায় গুরুতর ব্যবস্থা না নিলে স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার একমাত্র অবলম্বনটি হুমকির মুখে পড়বে।
চায়না দুয়ারি জাল জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর। অনুমোদন নেই এই জালের। কারেন্ট জালের চেয়েও ভয়ংকর এই জাল। যেহেতু কারেন্ট জাল নিষিদ্ধ, তাই কৌশলে এই জাল ব্যবহার করা হচ্ছে হাওরেছবি: মোছাব্বের হোসেন
কমছে পাখি, উজাড় হচ্ছে বন
বইঠাচালিত নৌকার মাঝি সাব্বির বলছিলেন, গত ১০ বছরে তিনি এত কম পাখি আর দেখেননি। আগে নৌকায় ঢুকলে পাখির ডানার শব্দে কান পাতা দায় ছিল। এখন পাখি আছে কি না, সেটাই টের পাওয়া যায় না। পাখিবিশেষজ্ঞরা বলছেন, উজানের পলিতে হাওর ভরাট, পাখির আবাসস্থল ধ্বংস, শিকার এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তার অভাবে পাখির সংখ্যা কমছে। বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে যেখানে প্রায় ৬০ হাজার পাখি ছিল, ২০২২ সালে সেখানে মাত্র ২৭ হাজারের কিছু বেশি পাখি দেখা গেছে। রাতে ট্রলার চালিয়ে মাছ ধরা এবং ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের আলোও পাখিদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নষ্ট করছে। মাঝেমধ্যে উপজেলা প্রশাসন অভিযান চালালেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। জ্বালানির জন্য বন ধ্বংস এবং শুকনা মৌসুমে অন্য এলাকা থেকে আসা মহিষ ও গরুর অবাধ বিচরণও বনের পাশাপাশি পাখির আবাসস্থল নষ্ট করছে।
বন্য প্রাণী গবেষক সীমান্ত দীপু জানান, ২০ বছরের মধ্যে এ বছর সবচেয়ে কম পরিযায়ী পাখি এসেছে। যেখানে গড়ে দুই লাখ পাখি গণনা করা হতো, এবার এসেছে মাত্র ২৩ হাজারের মতো। বিষটোপ দিয়ে নির্বিচার পাখি মারা এবং মাছ ধরার ট্রলারের অবাধ চলাচল প্রশাসনের নজরদারির অভাব স্পষ্ট করে তোলে।
গোপনে করচগাছসহ অন্যান্য ঝাউবন কাটা অব্যাহত রয়েছে। বন বিভাগের কাছে গাছের সঠিক হিসাব না থাকলেও তারা গোলাবাড়ি এলাকায় পর্যবেক্ষণ টাওয়ারের আশপাশে ৪০ হাজার হিজল ও করচগাছের চারা লাগানোর দাবি করেছে। তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, নতুন লাগানো বেশির ভাগ চারা গাছ অযত্নে আধমরা হয়ে পড়ে আছে। স্থানীয় জেলেরা আশঙ্কা করছেন, দায়সারাভাবে লাগানো এসব গাছ বাঁচবে না।
বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. সাদ উদ্দিন চারা গাছ রক্ষার চ্যালেঞ্জের কথা বললেও স্থানীয় প্রবীণ মাঝিরা বন বিভাগের এই উদ্যোগের সমালোচনা করছেন। তাঁদের অভিযোগ, গাছ লাগানোর নামে অর্থ লুটপাট করা হচ্ছে এবং যেখানে গাছ লাগানো দরকার, সেখানে লাগানো হচ্ছে না।
হাওর আছে, নেই মাছের সুদিন
একসময় চিতল মাছের ‘খনি’খ্যাত আলংডোয়ার এখন মাছশূন্য। মাছের উৎপাদন বাড়াতে একসময় বিলে বাঁশ ও গাছের ডাল ফেলা হতো এবং সেগুলোকে বিশেষ পাহারায় রাখা হতো। কিন্তু টাঙ্গুয়ার হাওরে বিগত দিনে এসবের কিছুই করা হয়নি। বর্তমানে কোজানজাল ও বেড়জালের পাশাপাশি ‘চায়না দুয়ারি’ নামের এক প্রকার মাছ ধরার ফাঁদ ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বন্য প্রাণী গবেষক সীমান্ত দীপু বলছেন, চায়না দুয়ারি জাল দিয়ে অবাধে মাছ ও জলজ প্রাণী নিধন করা হচ্ছে। এমনকি বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মাছ মারার মতো ভয়াবহ ঘটনাও ঘটেছে; যাতে শুধু মাছ নয়, অন্যান্য প্রাণীও মারা গেছে। ছোট ছোট হাওর ইজারা দেওয়ার ফলে ইজারাগ্রহীতারা আশপাশের আরও কয়েকটি হাওরের মাছ সাবাড় করছেন। জেলা মৎস্য বিভাগের কাছে টাঙ্গুয়ার হাওরের মাছ উৎপাদন নিয়ে আলাদা কোনো তথ্য নেই। তাদের হিসাব অনুযায়ী, সুনামগঞ্জ জেলায় ২০২১-২২ সালে মাছের উৎপাদন দেখানো হয়েছে ১ লাখ ৯ হাজার ৫১৭ মেট্রিক টন; তার মধ্যে হাওরের অংশে ৩২ হাজার ৯৬ মেট্রিক টন।
জানতে চাইলে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. শামশুল করিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা সব হাওরের কথাই চিন্তা করি। এর মধ্যে টাঙ্গুয়ার হাওরও রয়েছে। হাওরে মাছের উৎপাদন বাড়াতে সরকারের একটি প্রকল্প নেওয়ার চিন্তা আছে।’ আগে ঝুড়িভর্তি মাছ মিলত। আমিনা বেগম সেই মাছ একা বেছে কূল পেতেন না। সাহায্য করতেন অন্য স্বজনেরাও। এখন সেই যুগ আর সেই। পাতের মাছটুকুও জালে পড়ছে না। তবে স্থানীয় জেলেরা বলছেন, একসময় যেখানে প্রচুর দেশি মাছ পাওয়া যেত, এখন সেখানে চাষের পাঙাশ ও তেলাপিয়া বিক্রি হয়। দেশি মাছের আকাল পড়েছে। হাওরের মানুষের মূল পেশা মূলত কৃষি ও মাছ ধরা। এই দুই পেশাতেই সংকট দেখা দিয়েছে। কৃষিতে ঝুঁকি বেড়েছে, মাছ কমে গেছে। এর বাইরে টাঙ্গুয়ার হাওরপারের কিছু মানুষ সীমান্তের কয়লা ও পাশের যাদুকাটা নদীতে বালুশ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। কয়লা আমদানি ২০১৬ সাল থেকে অনিয়মিত। যাদুকাটায় এখন ড্রেজার ও অন্যান্য যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ায় শ্রমিকের কাজ কমে গেছে। বিশেষ করে ২০১৭ সালে হাওরে ব্যাপক ফসলহানির পর কাজের সন্ধানে বহু মানুষ এলাকা ছেড়েছে। অনেকে সীমান্তে চোরাচালানের শ্রমিক হিসেবে যুক্ত হয়ে পড়েছে।
হাওরের প্রবীণ বাসিন্দা জফুরা বেগম (৭৫) আক্ষেপ করে বলেন, আগে গোসল করার সময় পায়ে মাছ লাগত, রাতে পাখির ডানার শব্দে ঘুম আসত না। ভাতের অভাব থাকলেও মাছের অভাব ছিল না। এখন ফিশারির পাঙাশ কিনে খেতে হয়।
নাব্য হারাচ্ছে সোমেশ্বরী, হুমকিতে শতবর্ষী মধ্যনগর বাজার
আমারদেশ পত্রিকা, মধ্যনগর (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

এক সময়ের খরস্রোতা সোমেশ্বরী নদী এখন মৃতপ্রায়। আমার দেশ
সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সোমেশ্বরী নদী ক্রমেই নাব্য হারিয়ে চরে পরিণত হচ্ছে। প্রায় দেড়শ বছর আগে এ নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে মধ্যনগর বাজার। একসময় দেশের অন্যতম প্রধান ধানের আড়ত হিসেবে পরিচিত এ বাজার এখন নদী সংকটে অস্তিত্বের লড়াইয়ে কোনো রকমভাবে টিকে আছে।
মৌসুমভিত্তিক নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাজারের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। এ বাজারে ধানসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য আনা-নেওয়ার প্রধান মাধ্যম হলো নদীপথ। এ বাজারের সঙ্গে প্রধান বাণিজ্যিক সম্পর্কিত শহর মুন্সীগঞ্জ, চাঁদপুর, ভৈরব, আশুগঞ্জ, জেলা শহর সুনামগঞ্জ এবং নেত্রকোনার কলমাকান্দা থেকেও মালামাল পরিবহনের একমাত্র ভরসা এ নদী। কিন্তু হেমন্তের শুরুতেই নদীর পানি কমে গিয়ে তলদেশ ভেসে উঠে, সৃষ্টি হয় বিস্তীর্ণ চর। ফলে মালামাল পরিবহনে বাড়ছে দুর্ভোগ।
বর্তমানে একাধিক স্থানে পণ্য নামিয়ে নৌকা বদল করে পরিবহন করতে হচ্ছে। এতে সময় ও খরচ দুটিই বেড়ে গেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বাজারের সার্বিক বাণিজ্যে। নদীর নাব্য কমে যাওয়ায় কৃষিজমিতে সেচ দিতে গভীর নলকূপ বা সাবমার্সিবল পাম্পই একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি আগাম বন্যার আশঙ্কায় কৃষকদের উদ্বেগও বেড়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও নৌকার মাঝিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পৌষের মাঝামাঝি থেকে চৈত্র মাস পর্যন্ত নদীর বিভিন্ন অংশে পানি কমে যায়। কোথাও কোথাও নদীর তলদেশ পুরোপুরি জেগে উঠে। বড় নৌকার চলাচল প্রায় তিন থেকে চার মাস বন্ধ থাকে। পানি কমে এমন অবস্থা হয় কিছু স্থানে জেগে ওঠা চরে স্থানীয়রা ধান রোপণ করেন। মধ্যনগর বাজার আড়ত কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক বরুণ রায় বলেন, আগে মৌসুমজুড়ে এক হাজার মণের বেশি ধান এক নৌকাতেই আনা-নেওয়া করা যেত। এখন ছোট নৌকায় ভাগ করে আনতে হয়। মাঝপথে নৌকা বদলাতে হয়। এতে সময় বেশি লাগে, খরচও অনেক বেড়ে যায়। মধ্যনগর বাজারের মুদি ব্যবসায়ী শম্ভু রায় বলেন, আগের তুলনায় মালামাল পরিবহনে খরচ প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে গেছে। ক্যারিং খরচ বাড়ায় পণ্যের দামেও প্রভাব পড়ছে। মৎস্য ব্যবসায়ী মুখলেছ মিয়া বলেন, নদীটা বাঁচলে বাজার বাঁচবে। এখন যেভাবে চরে পরিণত হচ্ছে, তাতে কয়েক বছর পর হয়তো নৌ চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। মধ্যনগর বাজার বণিক সমিতির সভাপতি আবুল বাশার বলেন, নদীটির নাব্য হারানোর ফলে কৃষির পাশাপাশি মাধ্যনগর বাজারেও মারাত্মকভাবে প্রভাব পড়ছে। কৃষিপণ্যসহ অন্যান্য পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও আড়তদার সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে নদী খননের দাবি জানিয়ে আসছি। দ্রুত খননকাজ শুরু না হলে মধ্যনগর বাজার তার ঐতিহ্য ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব হারাবে। সুনামগঞ্জ জেলা কৃষক সমিতির আহ্বায়ক অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, আমাদের এ নদীটি খনন করা এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। আমি প্রায় দেড় দশক ধরে এ সোমেশ্বরী ও গুমাই নদী খনন করে কংস নদীর সঙ্গে সংযুক্ত করার জন্য বিভিন্নভাবে দাবি জানিয়ে আসছি। এ নদীগুলো খনন করা গেলে এ হাওর এলাকার কৃষি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, সেচব্যবস্থা উন্নত হবে এবং বন্যার ঝুঁকি কমবে। একই সঙ্গে মধ্যনগর বাজারও বাণিজ্যিকভাবে নতুন প্রাণ ফিরে পাবে।’ এ বিষয়ে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সুনামগঞ্জ কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, সুনামগঞ্জের প্রায় ১৯টি নদী খননের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ১২টি নদী সমন্বিত ড্রেজিং প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। শুমেশ্বরী নদীও সেই সমন্বিত ড্রেজিং প্রকল্পের তালিকায় রয়েছে। অনুমোদন পেলেই খননকাজ শুরু করা সম্ভব হবে।
তৃতীয় অধ্যায়
গবেষণার পদ্ধতি
৩.১ গবেষণার নকশা
এই গবেষণাটি একটি বর্ণনামূলক এবং আংশিকভাবে বিশ্লেষণাত্বক ধরনের সমীক্ষাভিত্তিক গবেষণা। যেহেতু গবেষণার উদ্দেশ্য হলো টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র্যের উপর প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব এবং ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নিরূপণ করা, সেহেতু এ গবেষণায় পরিসংখ্যানগত তথ্যের মাধ্যমে বাস্তব পরিস্থিতির বর্ণনা এবং সংশিষ্ট উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণাটি কাঠামোগতভাবে নিম্নোক্তভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে।
প্রাথমিক তথ্যভিত্তিক: তথ্য সরাসরি ভুক্তভোগী জনগণের নিকট হতে সংগৃহীত হয়েছে। পরিমাণগত এবং গুণগত তথ্য একত্রে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষণা পদ্ধতির ধরন:
-নির্ধারিত প্রশ্নমালার মাধ্যমে ১০০ জন উত্তরদাতার নিকট হতে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
- সরেজমিনে উপস্থিত থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে যাতে বাস্তব অভিজ্ঞতা অন্তর্ভুক্ত করা যায়।
গবেবণা নকশা:
-নির্দিষ্ট সময়কালে একবারে তথ্য সংগ্রহ করে তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
- এখানে কোনো কৃত্রিম পরীক্ষা বা নিয়ন্ত্রণ প্রয়োগ করা হয়নি; বরং প্রাকৃতিক বাস্তবতা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।
তথ্য সংগ্রহের কৌশল:
-পূর্বনির্ধারিত প্রশ্নমালা ব্যবহার করে সরাসরি সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
- ভূক্তভোগীদের আচরণ ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং সীমিত অপ্রাতিষ্ঠানিক আলোচনা থেকেও কিছু গুণগত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
এই গবেষণা নকশার মাধ্যমে টাঙ্গুয়ার হাওরের প্রকৃতি, এর দুর্যোগের প্রভাব, ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা এবং সরকারের করণীয় বিষয়ে একটি বাস্তবভিত্তিক ও তথ্যসমৃদ্ধ বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হয়েছে, যা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা গ্রহণে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।
৩.২ নমুনা নির্বাচন পদ্ধতি
গবেষণার উদ্দেশ্য পূরণের জন্য টাঙ্গুয়ার হাওর তীরবর্তী এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা, মতামত ও জীবন বাস্তবতা সরাসরি জানার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তাই এই গবেষণায় অলাভজনক উদ্দেশ্যে নির্বাচন পদ্ধতির অধীনে উপযুক্ততা-ভিত্তিক নমুনা নির্বাচন কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। অর্থাৎ যেসব ব্যক্তি বা পরিবার সরাসরি হাওর এলাকায় বসবাস করেন শুধুমাত্র তাদেরকেই এই গবেষণার নমুনা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
নমুনার আকার:
গবেষণার আওতায় মোট ১০০ জন উত্তরদাতাকে নমুনা হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে, যারা টাঙ্গুয়ার হাওর তীরবর্তী বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ গ্রাম থেকে নির্বাচিত। এই সংখ্যা গবেষণার লক্ষ্য ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণের জন্য যথেষ্ট বিবেচিত হয়েছে।
নমুনা নির্বাচনের মূল বিবেচ্য বিষয়সমূহ:
১. প্রত্যক্ষভাবে দুর্যোগের শিকার হওয়া ব্যক্তি/পরিবার।
২. দুর্যোগের কারণে জীবিকার উপর কী প্রভাব পড়েছে ব্যক্তি/পরিবার।
৩. দুর্যোগের কারণে মাছ ধরা, কৃষি বা অন্য কোনো পেশার ক্ষেত্রে কী ধরনের সমস্যা হয়েছে ব্যক্তি/পরিবার।
৪। হাওরে বসবাসকারী এবং পরিবেশ নিয়ে সচেতনতা ও মতামত প্রদান করতে আগ্রহী ব্যক্তি।
৪. বয়স, লিঙ্গ ও পেশাগত দিক থেকে বৈচিত্র্য বজায় রাখা হয়েছে যেন নানা দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়।
কারণ ভিত্তিক নির্বাচন পদ্ধতির সুবিধা:
* হাওরে বসবাসকারী সরাসরি ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করে গবেষণাটি বাস্তব ভিত্তিক ও প্রাসঙ্গিক তথ্য তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে।
* সময়, অর্থ ও কার্ষকারিতার বিবেচনায় এই পদ্ধতি সহজ ও ফলপ্রসূ হয়েছে।
দুর্যোগের পর জীববৈচিত্র্যের (যেমন মাছ, পাখি, উদ্ভিদ) ওপর কী ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করেছেন?
হাওরে হাউসবোট বা পর্যটকদের আনাগোনা কি জীববৈচিত্র্যের উপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে?
প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে আপনার আর্থিক অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি?
হাওর অঞ্চলের মানুষের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা কি জরুরি?
আপনি কি জীববৈচিত্র্য এবং পরিবেশ সংরক্ষণে কোনো ধরনের সচেতনতামূলক কাজে জড়িত আছেন?
প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য সরকারের কাছে আপনার কোনো বিশেষ আবেদন আছে কি?
এলাকা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে যাতে সামগ্রিক চিত্র প্রতিফলিত হয়। এই নমুনা নির্বাচন পদ্ধতি গবেষণার গুণগত মান বজায় রাখতে সহায়ক হয়েছে এবং উপাত্ত বিশ্লেষণে নির্ভরযোগ্যতা প্রাদান করেছে।
৩.৩ তথ্য সংগ্রহের মাধ্যম ও প্রক্রিয়া
তথ্য সংগ্রহের প্রধান মাধ্যম:
প্রাথমিক তথ্য
১. সংগঠিত প্রশ্নমালা: গবেষণার জন্ম একটি সুনির্দিষ্ট ও পূর্বনির্ধারিত প্রশ্নমালা প্রস্তুত করা হয়, যাতে উন্মুক্ত ও বন্ধ উভয় ধরনের প্রশ্ন থাকে। এতে সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থা, প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ, সরকারি সহায়তা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ইত্যাদি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
২. সাক্ষাৎকার: প্রত্যেক উত্তরদাতার সাথে সরাসরি সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে প্রশ্নমালার উত্তর সংগ্রহ করা হয়। এতে করে উত্তরদাতার ভাব, অভিব্যক্তি ও অতিরিক্ত মতামতও সংগ্রহ করা সম্ভব হয়।
৩. পর্যবেক্ষণ: সরেজমিন পরিদর্শনের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা, বসতবাড়ির ধ্বংস, মানুষের জীবনযাত্রার অবস্থা, নদীর ভাজনপ্রবণতা ইত্যাদি পর্যবেক্ষণ করে গুণগত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
৪. অনানুষ্ঠানিক আলোচনা: কিছু ক্ষেত্রে গ্রাম প্রধান, শিক্ষক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বৃদ্ধ জনগণের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা করা হয়েছে, যার মাধ্যমে অতিরিক্ত বাস্তব অভিজ্ঞতা ও প্রেক্ষাপট জানা সম্ভব হয়েছে।
২য় পর্যায়ের তথ্য
গবেষণার পরিপূর্ণতা ও প্রাসঙ্গিকতা বৃদ্ধির জন্য ২য় পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে বিভিন্ন উৎস থেকে:
* সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার প্রতিবেদন, যেমন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর, বিআইডিএস, পানি উন্নয়ন বোর্ড, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং মধ্যনগর উপজেলা প্রশাসনের প্রকাশনা।
* জার্নাল ও গবেষণা প্রবন্ধ, যা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের পূর্ববর্তী গবেষণাগুলোর তথ্য দিয়েছে।
* পত্রিকা, ওয়েবসাইট ও নিউজ পোর্টাল, বিশেষ করে শিল্পায়ন ও দূষণ সংক্রান্ত সাম্প্রতিক তথ্য সংগ্রহে সহায়ক হয়েছে।
তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়া:
* তথ্য সংগ্রহের জন্য সর্বপ্রথমে প্রশ্নমালার পাইলট টেস্ট করা হয়, যাতে প্রশ্নগুলোর স্পষ্টতা ও প্রাসঙ্গিকতা যাচাই করা যায়।
* এরপর তিনটি ভিন্ন এলাকা নির্বাচন করে, যেখানে হাওরের জনগন তুলনামূলক বেশি বসবাস করে।
* প্রতিটি উত্তরদাতার কাছে গিয়ে সরাসরি সাক্ষাৎকার গ্রহণের মাধ্যমে উত্তর সংগ্রহ করা হয়েছে।
* তথ্য সংগ্রহের সময় গোপনীয়তা রক্ষা এবং নৈতিকতা মেনে চলা হয়েছে। উত্তরদাতাদের সম্মতি নিয়েই তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
তথ্য সংগ্রহের সময়কাল:
তথ্য সংগ্রহের কার্যক্রম জুলাই ২০২৫ - ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সময়কালের মধ্যে সম্পন্ন করা হয়।
এই প্রক্রিয়াগুলোর মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্য গবেষণার উদ্দেশ্য পূরণে গুরুতৃপূর্ণ ভুমিকা পালন করেছে এবং
বাস্তব ভিত্তিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন সম্ভব হয়েছে।
৩.৪ উপাত্ত বিশ্লেষণ পদ্ধতি
প্রাথমিক এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে দুই ধরনের তথ্য এবং উপাত্ত ব্যবহার করা হয়েছে। প্রাথমিক উপাত্ত গুলোর মধ্যে প্রশ্নমালা জরিপ, পর্যবেক্ষণ, এবং সাক্ষাৎকার উল্লেখযোগ্য এবং দ্বিতীয় পর্যায়ের উপান্তের মধ্যে বিভিন্ন তথ্য বই, জার্নাল, থিসিস আকারে প্রকাশিত অনলাইন থেকে এবং মানচিত্র বিশ্লেষনের জন্য CEGIS এবং Gogle Earth থেকে উপাত্ত সংগ্রহ এবং বিশ্লেষণ করা হয়েছে। মানুষের জীবনযাত্রার মান এবং অর্থ-সামাজিক অবস্থার গবেষণা মুলক বিশ্লেষন করার জন্য প্রশ্নমালা জরিপ, রিমোট সেনসিং (RS), জি আই এস (GIS), জি পি এস (GPS) এর সাহায্য নেওয়া হয়েছে। তথ্য উপাত্ত গবেষণা এবং বিশ্লেবণের জন্য মাইক্রোসফট এক্স এল ব্যবহার করা হয়েছে। সকল তথ্য এবং উপাত্য ব্যবহার করে সুনির্দিষ্ট গবেষণা পদ্ধতির মাধ্যমে এ গবেষণাকে অর্থবহ করার চেষ্টা করা হয়েছে। এছাড়া পরিসংখ্যানিক এবং ভৌগোলিক পদ্ধতিপ্রয়োগ করে তথ্য এবং উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হয়েছে। মাইক্রোসফট এক্স এল এর মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের আয়তলেখের মাধ্যমে গবেষণাটি বিশ্লেষণ করে প্রকাশ করা হয়েছে।
নিম্নে তথ্য ও উপাত্তের ধরন চিত্রের মাধ্যমে দেখানো হল:
চিত্র-০১: তথ্য ও উপাত্তের ধরণ

উৎসঃ গবেষণা কাল (অক্টোবর-২০২৫)
৩.৫ গবেষণা এলাকার বিবরণ
জীবন যাত্রার মান এবং আর্থ-সামাজিক অবস্থা, অঞ্চল ভেদে ভিন্ন হয় এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ ও মানবসৃষ্ট কর্মকান্ডের উপর নির্ভর করে। তেমনি টাঙ্গুয়ার হাওর অঞ্চলের মানুষ এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ পরস্পরকে প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জীবন যাত্রার মান এবং আর্থ-সামাজিক অবস্থার তারতম্য ঘটায়। হাওরের জীবন যাত্রার মান এবং আর্থ সামাজিক অবস্থা মূলত কৃষি ও মৎস শিকারের উপর নির্ভর করে যা অন্য অঞ্চলের থেকে ভিন্ন। হাওর অঞ্চলের প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট ঝুঁকি তথা- বন্যা, প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢল, বাঁধ ভাঙা সহ অন্যান্য ঝুঁকির মাত্রা অন্য অঞ্চলের থেকে তুলনামূলক ভাবে বেশি । যা হাওর অঞ্চলের অর্থনৈতিক, সামাজিক, প্রাকৃতিক ও মানবিক কাঠামো এবং পেশা গত ভিন্নতা লক্ষ করা যায়। তাই এই গবেষণা কাজের জন্য টাঙ্গুয়ার হাওরকে সমীক্ষা এলাকা হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। ভারতের মেঘালয়ের পাদদেশে অবস্থিত এই টাঙ্গুয়ার হাওর । টাঙ্গুয়ার হাওর বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের একটি বৃহৎ জলাভূমি যা ২৫˙০৯‘ থেকে ২৫˙১২‘ উত্তর এবং ৯১˙০৮‘ থেকে ৯১˙০৭‘ পূর্ব, সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর এবং মধ্যনগরউপজেলার অন্তর্গত। টাঙ্গুয়ার হাওরের বিস্তার ১০০ বর্গ কিমি যার মধ্যে ২৮০২.৩৬ বর্ণ হেক্টর জলাভূমি । মোট জনসংখ্যার পরিমাণ প্রায় ৪০,০০০ (Nayeem, 2015) । টাঙ্গুয়ার হাওর ৪৬ গ্রামের সঙ্গে সংযুক্ত যা প্রতিটি গ্রামের অর্থনৈতিক, সামাজিক, জৈবিক, রাজনৈতিক সকল ধরনের উন্নয়ন জড়িত। অধিকাংশ মানুষের জীবনযাত্রা কৃষি এবং মৎস্য শিকারের উপর নির্ভরশীল ।
চিত্র-০২: মানচিত্রে টাঙ্গুয়ার হাওর
উৎসঃ রিডিউলজি রিস্ক এসেসমেন্ট টাঙ্গুয়ার হাওর (২০১৯)
চিত্র-০৩: মানচিত্রে টাঙ্গুয়ার হাওরের স্পেসিফিক এরিয়া, মধ্যনগর ও তাহিরপুর উপজেলা
![]() |
উৎসঃ রিডিউলজি রিস্ক এসেসমেন্ট টাঙ্গুয়ার হাওর (২০১৯)
চতুর্থ অধ্যায়ঃ তথ্যগত আলোচনা ও ফলাফল বিশ্লেষণ
৪.১ হাওরের বসতির ধরন এবং ভূমি ব্যবহার
ভৌগোলিক দিক থেকে হাওরের বসতির ধরন এবং ভূমি ব্যবহারে ভিন্ন ধরনের বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়। বসতির ধরন, কৃষি, অর্থনৈতিক এবং প্রাকৃতিক কাঠামোর ভিন্নতা হাওর অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উপর নির্ভর করে । হাওর অঞ্চলে মূলত জেলে, কৃষক সহ নানা পেশাজীবী মানুষ বসবাস করে। তবে জেলে এবং কৃষকের আধিক্য লক্ষ্য করা যায়। ভিন্ন পেশার মানুষের জীবন যাত্রার মান, বসতির ধরন, ভূমি ব্যবহার এবং আর্থ-সামাজিক কাঠামোর ভিন্নতা দেখা যায়। হাওর অঞ্চলে মূলত কাঁচা, অর্ধ-পাঁকা, পাকা ও বাঁশ-কাঠের সমন্থিত বিক্ষিপ্ত এবং রেখাকৃতি ধরনের বসতি দেখা যায়। বসতির ধরন অনুযায়ী পাঁকা ১ ভাগ, অর্ধ-পাঁকা ৬ভাগ, কাঁচা ৭৮ ভাগ এবং ঝুঁপড়ি বা বেড়া ১৫ ভাগ দেখা যায়।
চিত্র-০৫: বসতির ধরণের চার্ট

উৎসঃ বিবিএস (২০১১)
হাওরের ভূমি ব্যবহার ভূমির উচ্চতার উপর নির্ভর করে। সাধারণত উঁচু ভূমিতে বসতি স্থাপন করে এবং বৃক্ষ রোপন করা হয়। বসতির চারদিকে ইট অথবা পাথর দ্বারা ভূমি ক্ষয় রোধকারী বাঁধ দেওয়া হয় যা বসত ভিটা সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মধ্য ভূমি মূলত বর্ষা কালে কিছু সময়ের জন্য প্লাবিত হয়। মধ্য ভূমির পরে খননকৃত পুকুর অথবা হ্রদ বিদ্যমান যেখানে মৎস্য চাষ করা হয়। অতঃপর ক্রমান্বয়ে হাওরের কাছাকাছি করছ গাছের সমারোহ যা হাওর অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর বসতি ও অনান্য ভূমি সুরক্ষায় কাজ করে। টাঙ্গুয়ার হাওর অঞ্চলের উচ্চতার ভিত্তিতে ভূমির ব্যবহারের ভিন্নতা প্রচ্ছদের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হল:
চিত্রঃ ০৬ : ভূমিরূপের ভিত্তিতে ভূমি ব্যবহার

উৎসঃ গবেষণা কাল (অক্টোবর-২০২৫)
টাঙ্গুয়ার হাওর অঞ্চলের ভূমি ব্যবহার খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারন সেখানকার মানুষ নিজেদের বিভিন্ন দুর্যোগের হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে। তারা বসতি থেকে দূরুত্বের সাথে সাথে বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে থাকে ভূমি ব্যবহারে । উদাহরনস্বরূপ: প্রথম স্তরে বসতির পাশে বড় গাছ যেমন: আম, কাঁঠাল, জাম, পেয়ারা, বরই ইত্যাদি গাছ। যেগুলো মাটিকে ক্ষয়রোধ করার সাথে সাথে খাবারের যোগান দিতে থাকে । ২য় স্তরে করছ যা এই অঞ্চলের ভিন্নতা । এই করছ উদ্ভিদ হাওর অঞ্চলের প্রধান উভিদ যা পানিতে হাওর অঞ্চল নিমজ্জিত হলেও জ্বালানীর যোগান দিয়ে থাকে । করছ উতভিদ মুলত পানিতে বেঁচে থাকে। ৩য় স্তরে ঢোল কলমি যা সহজে পানি এবং মাটিতে জন্মে থাকে । ঢোল কলমি জ্বালানীর যোগান পাশাপাশি ভূমির ক্ষয়রোধে কাজ করে। ৪র্থ স্তরে অর্থাৎ পানিতে কলমি শাক, শাপলা, পদ্ম জলজ উদ্ভিদ জন্ম হয় যা তাদের খাবারের চাহিদা মেটায়। সুতরাং টাঙ্গুয়ার হাওর অঞ্চলের মানুষের নিজেদের আত্মরক্ষার নিজন্ব কিছু কৌশল রয়েছে যা অন্যান্য অঞ্চল থেকে ভিন্ন এবং ভূমি ব্যবহারের সাথে সম্পর্কিত, যা নিচে দেখানো হল:
চিত্র-০৭: বসতির দূরত্বের সাথে সাথে উত্তিদের ধরনের পরিবর্তন

উৎসঃ গবেষণা কাল (অক্টোবর-২০২৫)
হাওরের ভূতাত্তিক প্রক্রিয়া হাওর অঞ্চলের ভূমি ব্যবহারে গুরুতৃপূর্ণ ভূমিকা রাখে। হাওরের বিভিন্ন ধরনের ভূতান্তিক প্রক্রিয়া চলমান যা ভূমির ঘনতৃ, ঢাল, উচ্চতা ইত্যাদির উপর নির্ভর করে। নিম্নে ভূমিরূপ এবং চলমান প্রক্রিয়া তালিকা আকারে দেখানো হল:
চিত্র-০৮: টাঙ্গুয়ার হাওর অঞ্চলের প্রজাতির নমুনা
|
ভূমিরূপ |
চলমান প্রক্রিয়া |
|
হাওর |
১। ভূমিক্ষয় ২। পলিবহন ৩। ভূমিসঞ্চয় |
|
প্লাবন ভূমি |
১। পৃষ্টপ্রবাহ ২। পাহাড়ী ঢল ৩। ভূমিক্ষয় ৪। ভূমিসঞ্চয় |
উৎসঃ মিলার (১৯৬০)
৪.২ টাঙ্গুয়ার হাওর অঞ্চলের জীব-বৈচিত্র্য
টাঙ্গুয়ার হাওর সুনামগঞ্জ জেলার একটি বৃহৎ জলাভূমি যেখানে ভূমির উচ্চতার ভিত্তিতে জীব বৈচিত্রের তারতম্য হয়। জীব বৈচিত্র্য মূলত হাওড়ের প্রাকৃতিক এবং মানবসৃষ্ট পরিবেশের উপর নির্ভর করে এবং মৌসুম ভেদে জীব বৈচিত্রের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। সকল ধরনের প্রজাতি ভূমির ধরন এবং উচ্চতার সাথে তারতম্য হয়। তবে উঁচুভূমিতে প্রজাতির সংখ্যা তুলনামূলক ভাবে বেশি । স্থলজ এবং জলজ দুই ধরনের স্থানে ভিন্ন ভিন্ন উদ্ভিদ এবং প্রাণী দেখা যায়।
হাওর অঞ্চলের জীবন যাত্রার মান জীব বৈচিত্র্যের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। হাওর অঞ্চলের জীব বৈচিত্তা হাওর অঞ্চলের জনগোষ্ঠীকে এবং প্রাকৃতিক পরিবেশকে সুরক্ষিত রাখার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকি কমাতে অগ্রুনী ভূমিকা পালন করে । জীব বৈচিত্র্যের সাথে হাওর অঞ্চলের জীবন যাত্রার মান জড়িত এবং নির্ভরশীল । হাওরের যে সকল জীব বৈচিত্র্য দেখা যায় সেগুলো সংরক্ষণের মাধ্যমে হাওর অঞ্চলের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি যা হাওর অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর জীবন যাত্রার মান সুন্দর সম্ভাবনাময় অবস্থান তৈরি করতে সাহায্য করবে। হাওর অঞ্চল অন্য অঞ্চলের থেকে পরিবেশগত এবং জীব বৈচিত্রের পার্থক্য দেখা যায়। করছ, ঢোলকলমি, হিজল সহ নানা ধরনের অনন্য উত্ভিদ দেখা যায় যা সাধারণত পাহাড়ী অঞ্চল বা অন্য ভূমিরূপে দেখা যায় না। এ ধরনের উভিদ মুলত ভূমিক্ষয় রোধ সহ বন্যর ক্ষতির পরিমাণ কমাতে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে ।
৪.৩ টাঙ্গুয়ার হাওর অঞ্চলের প্রধান সমস্যা
টাঙ্গুয়ার হাওর অঞ্চল বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ইত্যাদি সমস্যায় জর্জরিত। অত্র গবেষণায় টাঙ্গুয়ার হাওর অঞ্চলের প্রধান প্রধান সমস্যাগুলো নিম্নে দেখানো হল:
· যোগাযোগ ব্যবস্থা
· শিক্ষা ব্যবস্থা
· পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থা
· অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব
৪.৪ যোগাযোগ ব্যবস্থা
হাওর অঞ্চলের অপর্যাপ্ত যোগাযোগ ব্যবস্থার ফলে হাওর জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সম্মুীন হতে হয় । বিশেষ করে, বর্ষা কালে সকল ধরনের স্থল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। বর্ষা কালে মূলত ডিডি নৌকা অথবা অন্য কোন পানিতে চালিত যানবাহন ব্যবহার করা হয়। শুঙ্ক মৌসুমে স্থল যোগাযোগ মাধ্যম থাকলেও তা অপর্যাপ্ত । টাঙ্গুয়ার হাওরে সারা বছর বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চলাচল করে যার মধ্যে ডিঙিনৌকা, কোন্দা, ইঞ্জিন চালিত নৌকা, ছোট জাহাজ, ভ্যান, অটো, অটোরিকশা, মেটর বাইক, সাইকেল, ছোট বড় ট্রাক ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। শুক্ক মৌসুমে মোটরসাইকেলের আধিক্য বেশি। এই মোটরসাইকেল গুলো অধিকাংশ সময় বিভিন্ন মৌসুম এবং স্থল যোগাযোগের ধরন অনুযায়ী চালিত যানবাহন গুলো তালিকাবদ্ধ ভাবে দেখানো হল:
ভাড়ায় চালিত হয়।
চিত্র-০৯: বিভিন্ন মৌসুম এবং স্থল যোগাযোগের ধরন অনুযায়ী চালিত যানবাহন
|
পানিতে চালিত বাহন |
পাকা রাস্তায় চালিত বাহন |
মৌসুমী কাচা রাস্তায় চালিত বাহন |
উৎসঃ গবেষণা কাল (অক্টোবর-২০২৫)
৪.৫ পয়ঃনিক্ষাশন
টাঙ্গুয়ার হাওর অঞ্চলের পয়গ্নিষ্কাশন ব্যবস্থা মৌসুম অনুযায়ী পরিবর্তনশীল । হাওরের অর্থনৈতিক অবস্থার তারতম্যে হাওর অঞ্চলের জনগোষ্ঠী পরিবেশ বান্ধব পয়গ্রনিষ্কাশন ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু করতে সক্ষম হয়ে ওঠেনি। পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা পরিবেশ বান্ধব না হওয়ার কারনে প্রতি বছর বিভিন্ন পানি বাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে পাশাপাশি হাওর জনগোষ্ঠী স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে বসবাস করে। হাওর অঞ্চলের স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমিয়ে সুরক্ষিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গঠনের জন্য পরিবেশ সহনশীল পয়গ্রনিষ্কাশন ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বর্তমানে হাওরের জনগোষ্ঠী পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সচেতন না হলেও বর্তমানে স্থায়ী শৌচাগার বৃদ্ধি পেয়েছে। জরিপের নমুনা পর্যালোচনা করে দেখা যায় ৫০ ভাগ স্থায়ী, ২৫ ভাগ ঝুলন্ত, সরাসরি হাওরের পানিতে ২০ ভাগ এবং খোলা আকাশের নীচে ৫ ভাগ মানুষ শৌচাগার হিসাবে ব্যবহার করে।
চিত্রঃ ১০: টাঙ্গুয়ার হাওর অঞ্চলের পয়নিষ্কাশন ব্যবস্থা

উৎসঃ গবেষণা কাল (সেপ্টেম্বর-২০২৫)
৪.৬ শিক্ষা ব্যবস্থা
সুনামগঞ্জ জেলার সাক্ষরতার হার ৪৯.৭৫ ভাগ (তথ্য বাতায়ন, ২০১৪) । হাওর অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিকুল পরিবেশের ফলে শিক্ষার হার তুলনামূলক ভাবে কম । তবে বর্তমানে ক্রমাগত শিক্ষার হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। হাওরের জনগোষ্ঠী বর্তমানে শিক্ষা সচেতন পাশাপাশি তাদের সন্তানদের উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করার প্রচেষ্টা বিদ্যমান। টাঙ্গুয়ার হাওর এবং শনির হাওর অঞ্চলে ৪৫ টি প্রাথমিক বিদ্যালয় সহ বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে যা অপর্যাপ্ত । প্রশ্নমালা জরিপের মাধ্যমে দেখা যায়, টাঙ্গুয়ার হাওরের জনগোষ্ঠীর মধ্যে অক্ষর জ্ঞান থেকে শুরু করে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত জনগোষ্ঠী বিদ্যমান ।
চিত্র-১১: টাঙ্গুয়ার হাওর অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থা

উৎসঃ রহমান (২০১৮)
৪.৭ হাওরের জনগোষ্ঠীর সমস্যা, ঝুঁকি এবং সম্ভাব্য সমাধান
টাঙ্গুয়ার হাওর অঞ্চল প্রাকৃতিক এবং মানবসৃষ্ট দুর্যোগের ফলে অত্যন্ত সমস্যা বহুল এবং ঝুঁকিপূর্ণ। হাওরে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা যায় যা হাওর অঞ্চলের মানুষকে ক্রমে ঝুঁকির দিকে ঠেলে দেয়। চলমান বিভিন্ন ধরনের সমস্যা এবং ঝুঁকি ক্রমশ মানুষের অর্থ সামাজিক কাঠামোতে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। হাওরের এই বিরূপ প্রভাব দেশের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে। টাঙ্গুয়ার হাওরের প্রাকৃতিক প্রভাব পরিহার করার সুযোগ না থাকলেও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব যা হাওর অঞ্চলের সমস্যা এবং ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করবে । হাওর অঞ্চলের বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সমাধান বিভিন্ন ধরনের পরিকল্পনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। তবে সমাধানের জন্য গবেষণার মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করাটাই মুখ্য ভূমিকা পালন করবে । একই সাথে সকল সমস্যার সমাধান সম্ভব না হলেও পর্যায়ক্রমে পরিকল্পনা গুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। পরিকল্পনা গুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের কৌশল ব্যবহার করা যেতে পারে। যা পরিকল্পনা সঠিক ভাবে বাস্তবায়নে সহযোগীতা করবে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গুলো এবং হাওরের জনগোষ্ঠীর সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
নিচে হাওরের কিছু সংখ্যক সমস্যা এবং সম্ভব্য সমাধান সারণীর মাধ্যমে দেখানো হল :
|
সমস্যা সমূহ |
সমস্যার সমাধান |
|
কৃষি জমি চাষাবাদে সমস্যা |
হাওর অঞ্চলের মানুষ মৎস্য এবং কৃষির উপর নির্ভর করে এবং বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ের শিকার হয়। কৃষকের মাঝে বিনামূল্যে কৃষি দ্রব্যাদি বিতরণ এবং বিনা সুদে অথবা এককালীন কৃষি জমি অর্থ বিতরণ করে কৃষি কাজে উৎসাহ প্রদান করা যেতে পারে। আধুনিক উন্নত কৃষি প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বহুল চাষাবাদের সমস্যা। প্রচারের মাধ্যমে কৃষককে সচেতন করে তোলা। উন্নত কৃষি প্রযুক্তি, সার ও কীটনাশকের ব্যবহার, উন্নত বীজ নির্বাচন ইত্যাদি বিষয়ে কৃষককে প্রশিক্ষণ দান করা এবং ভূমিহীন কৃষকদের সঠিক তালিকা নির্ণয় করে নিরপেক্ষ ভাবে খাস জমি বন্দোবস্ত করা । |
|
প্রাকৃতিক আপদ জনিত ঝুঁকি |
প্রাকৃতিক আপদ হাওর অঞ্চলের সবচেয়ে বেশি বিপর্যয়কারী হিসেবে পরিচিত। প্রাকৃতিক আপদের সাথে সবাই পরিচিত কিন্তু কিভাবে আপদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায় সে ধরনের সচেতনতার অভাব লক্ষ করা যায়। সুতরাং সরকারি অথবা বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন ধরনের জনকল্যান ও জনসচেতনতা মুলক সভার আয়োজন করে প্রাকৃতিক দুর্যোগ সম্পর্কে অবহিতকরন এবং কিভাবে নিজেদেরকে রক্ষা করা যায় সেই বিষয়ে জনসচেতনতা নিশ্চিতকরন। |
|
আকস্মিক বন্যা |
বাংলাদেশর হাওর এলাকায় প্রধান প্রধান দুর্যোগ গুলো হল- আকস্মিক বন্যা, বজ্রপাত, ঝড় , উচ্চ মাত্রায় ঢেউ ও নদীতীর ভাঙ্গন। প্রাকৃতিক নিয়ামকের সাথে সাথে আর্থ-সামাজিক বিষয়ক কারণ যেমন হাওরের আকস্মিক বন্যা। পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধকতা, ধান চাষী ও মাছ উৎপাদন কারীদের পানি ব্যবস্থাপনার দ্বন্দ, সঠিক সময়ে বাঁধ নির্মাণ ও মেরামত না হওয়া, সুশাসন সম্পর্কিত সমস্যা ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের অভাব আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বহুলাংশে বাড়িয়ে দিচ্ছে। ভৌগলিক অবস্থানের কারণে হাওর এলাকায় আকস্মিক বন্যা দেখা যায়। যা এ এলাকার প্রধান দুর্যোগ হিসেবে বিবেচিত। এর ফলে কৃষিষখাত সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যা জীবন ও জীবিকায় ব্যাপক প্রভাব ফেলে। নিয়মিত ভাবে মৌসুম ভিত্তিক এবং সাপ্তাহিক আবহাওয়ার পূর্বাভস হাওর এবং তদসংলগ্ন উজান অঞ্চল বিশ্লেষন পূর্বক ধান চাষে করণীয় বিষয় এবং আগাম বন্যার পূর্বাভাস এস এম এস/এ্যাপসের মাধ্যমে কৃষক পর্যায়ে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। |
|
পেশাগত সমস্যা |
হাওর অঞ্চলে মূলত কৃষি এবং মৎস্য শিকার করে পেশাজীবীদের জীবন নির্বাহ করে। পেশার মাঝে অভিন্নতার জন্য বিভিন্ন ধরনের সমস্যা এবং ঝুঁকির সম্মুখীন হতে হয়। সুতরাং পেশাগত সমস্যা সমাধানের জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ প্রদানের পাশাপাশি আর্থিক ভাবে সচ্ছলতার জন্য যোগ্যতা অনুযায়ী কর্ম প্রদান এবং বিভিন্ন পেশায় যাওয়ার সুযোগ প্রদান করতে হবে পাশাপাশি মৎস্য সংরক্ষণ আইন জোরদার ও বাস্তবায়ন করা এবং মৎস্য সম্পদ সংরক্ষনের ব্যাপারে জেলেদের সচেতন করা। |
|
অপর্যাপ্ত শিক্ষা ব্যবস্থার সুবিধাদি |
শিক্ষা মানুষের মৌলিক চাহিদা। একটি জাতিকে উন্নয়নের জন্য সুশিক্ষার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। কিন্তু পর্যাপ্ত শিক্ষার সুযোগের অভাব রয়েছে হাওর অঞ্চলে। সেক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভাবে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। দিবা বিদ্যালয়ের পাশাপাশি নৈশ বিদ্যালয়ের ব্যবস্থা করা জরুরি। বর্ষার মৌসুমসহ সারা বছর বাচ্চাদের স্কুলে যাওয়াসহ যথাযোগ্য পাঠদান নিশ্চত করতে হবে। বয়স্কদের জন্য পর্যাপ্ত সুবিধাদির ব্যবস্থ করে উৎসাহ প্রদান করতে হবে। সকল ধরনের শক্ষা উপকরন বিনামুল্য বিতরণসহ নিরক্ষর মুক্ত হাওর অঞ্চল গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি মাধ্যমিক এবং উচ্চ শিক্ষার পর্যাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনসহ প্রয়োজনীয় গবেষণার সুযোগ এবং বিভিন্ন ধরনের শিক্ষামূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করন। হাওর এলাকার উপযোগী শিক্ষা ভাসমান স্থানের উপর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান; দূর শিক্ষা পদ্ধতি চালু করণ ইত্যাদির ব্যবস্থার কথা ভাবা যেতে পারে। |
|
অনুন্নত এবং অপর্যাপ্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা |
যোগাযোগ যেকোন অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ব্যবসা বানিজ্য থেকে শুরু অনুন্নত এবং সকল ধরনের কর্মকান্ড যোগাযোগ ব্যবস্থার উপর অনেকাংশে নির্ভর করে। নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থায় কে অধিক গুরুত্ব দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহন করা যেতে পারে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য স্থায়ী সুপরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভাবে বিবেচনা করতে হবে । |
|
রাজনৈতিক প্রভাব (জলমহাল উল্লেখযোগ্য) |
বর্তমানে প্রতিটি অঞ্চলের সকল ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব লক্ষ করা যায়। যার ফলে হাওরের জনসাধারণ রাজনৈতিক প্রভাব নিজেদের অধিকার আদায়ে ব্যর্থ হয়। পাশাপাশি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার জন্য বিভিন্ন ধরনের (জলমহাল পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। এ ধরনের বিরূপ রাজনৈতিক কর্মকান্ডকে বশে এনে হাওড়ের উল্লেখযোগ্য) সকল জনগোষ্ঠীর সঠিক প্রাপ্য তথা অধিকার বাস্তবায়নের সুযোগ প্রদান করতে হবে। |
|
অর্থনৈতিক দুরাবস্থা |
হাওর অঞ্চলের সবচাইতে বড় সমস্যার মধ্যে অর্থনৈতিক দুরবস্থা অন্যতম। অর্থনৈতিক দুরবস্থার জন্য ব্যবসা-বানিজ্যের পাশাপাশি স্বাভাবিক কর্মকান্ড বিপর্যস্ত হয়। সুতরাং অর্থনৈতিক ভাবে হাওর অঞ্চলের জনগোষ্ঠীকে শক্তিশালী করার লক্ষে সরকার পাশাপাশি বেসরকারি এবং স্থানীয় জনসাধারণের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। অর্থনৈতিক ভাবে অনগ্রসর জনগনদের এককালীন অথবা বিনা সুদে খণ প্রদানের পাশাপাশি গ্রহীত ঋণ সঠিকভাবে কাজে লাগানো নিশ্চিত করণ। |
|
স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাব |
হাওরের জনগোষ্ঠীর সর্বদা বিভিন্ন ধরনের পানিবাহিত ও অনান্য রোগে আক্রান্ত হয় এবং স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে বসবাস করে। স্বাস্থ্য ঝুঁকি মোকাবেলার লক্ষ্যে জনসচেতনতার পাশাপাশি বিনামুল্যে প্রয়োজনীয় ঔষধাদি বিতরণ এবং জনস্বাস্থ্য রক্ষার্থে এবং জরুরি চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে হবে। |
|
অপরিকল্পিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও পুস্টিহীনতা |
অপরিকল্পিত এবং অসচেতন স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় সর্বদা পুষ্টিহীন মানুষের সংখ্যা বেশি। বিভিন্ন ধরনের অসচেতন অপরিকল্পিত স্বাস্থ্য এবং অপরিকল্পিত জীবনব্যবস্থার জন্য পুষ্টিহীনতায় এবং স্বাস্থ্য ঝুঁকিকে হাওর অঞ্চলের জনগোষ্ঠী। সুতরাং সুনির্দিস্ট পরিকল্পনা নিশ্চিতকরন স্বাস্থ্য ঝুঁকি এবং পুষ্টিহীনতা রক্ষায় বিশেষ ভূমিকা পালন করবে। |
|
বিশুদ্ধ খাবার পানির অভাব |
হাওর পানি দ্বারা পরিপূর্ণ থাকলেও বিশুদ্ধ পানির অভাব অনেক বেশি লক্ষনীয়। বিশুদ্ধ পানির অভাবে হাওর অঞ্চলের জনগোষ্ঠী বিভিন্ন ধরনের পানিবাহিত রোগের পাশাপাশি স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে থাকে। বিশুদ্ধ পানির অভাব নিশ্চিতকরনের জন্য টিউবওয়েল স্থাপন অথবা অন্য কোন উপায়ে বিশুদ্ধ পানির চাহিদা পুরন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। |
|
বাস্তু সংস্থান এবং বাস্তু তন্ত্রের অবক্ষয় |
বাস্তসংস্থান এবং যেকোনো পরিবেশকে টিকিয়ে রাখতে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বাস্তসংস্থান এবং বাস্ততন্ত্র। বাস্তুসংস্থান এবং বাস্ততন্ত্রের অবক্ষয় রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভাবে সংরক্ষন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। |
|
দারিদ্রতার হার বৃদ্ধি |
হাওরের তথা বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা দারিদ্রতা। দারিদ্রতা নিরসনের জন্য বিভিন্ন কারিগরী প্রশিক্ষণ এবং যোগ্যতা অনুযায়ী কর্ম নিশ্চিত করতে হবে। |
|
ব্যবসা বানিজ্যের অনাগ্রসরতা |
প্রতিটি উন্নত অথবা উন্নয়নশীল দেশে বা অঞ্চল ব্যবসা-বানিজ্যের ব্যাপক প্রসারের ফল। কিন্ত হাওরে ব্যবসা বাণিজ্যের বিভিন্ন সমস্যার জন্য ব্যবসা-বানিজ্যে অনগ্রসরতা বিদ্যমান। সকল অনগ্রসর সমস্যা সমাধান করে ব্যবসা- অনগ্রসরতা বানিজ্যেকে অগ্রসর করে হাওরের উন্নয়ন করতে হবে। |
চিত্র-১২: টাঙ্গুয়ার হাওরের জনগোষ্ঠীর জীবন-যাত্রার সমস্যা, সমাধান এবং সম্ভাবনা

উৎসঃ গবেষণা কাল (সেপ্টেম্বর-২০২৫)
৪.৮ হাওরের সম্ভাবনা
ভৌগোলিক অবস্থার দিক বিবেচনা করে এবং গবেষনার মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে রাস্তা নির্মাণ ও নৌ-যোগাযোগের উন্নায়ন করে এক এলাকার সঙ্গে অন্য এলাকার যোগাযোগ সুদূরপ্রসারী করা । এতে করে চিকিৎসা, ব্যবসায় বাণিজ্য ও শিক্ষাসহ সকল বিষয়ের উন্নতি হবে। টাঙ্গুয়ার হাওর সংরক্ষণের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো দেশের মৎস্য সম্পদ বৃদ্ধি করা। টাঙ্গুয়ার হাওরে মা মাছ নিরাপদে ডিম ছাড়বে আর বর্ষাকালে এই মাছগুলো ছড়িয়ে পড়বে দেশের অন্যান্য নদীনালা ও খালবিলে। সেজন্য টাঙ্গুয়ার হাওরের ইজারা প্রথা বিলোপ করে মাছের অভয়াশ্রম ঘোষণা করা জরুরী। হাওরাঞ্চলের প্লাবন ভূমিতে ব্যক্তি মালিকানা কিংবা সমাজ ভিত্তিক খাঁচায় মাছের চাষ পদ্ধতি চালু হয়েছে। যাতে আমিষের ঘাটতি পূরণসহ বেকারত্ব হাস ও অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা বৃদ্ধি পাবে। এ ব্যাপারে সকল মৎস্য চাষিদের প্রশিক্ষনের মাধ্যমে প্রশিক্ষিত করে তুলতে হবে। এ ব্যাপারে মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তাদেরকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বর্তমানে হাওরের জনসংখ্যার সিংহভাগ কৃষিকাজ, মৎস্য চাষ, ক্ষুদ্র ব্যবসা, চাকরি প্রভৃতির সঙ্গে জড়িত। প্রতিবছর হাওরে যে পরিমাণ ধান উৎপাদন হয় তা অনায়াসেই দ্বিগুণ করা সম্ভব; যদি জমির জলাবদ্ধতা দূর করে তা দুই বা তিন ফসলি জমিতে রূপান্তর করা যায়। অপরদিকে জলাবদ্ধ-সহিষ্কু জাতের বা গভীর পানির আমন ধানের জাতের চাষ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। হাওরের সমস্যা সমুহের সমাধান এবং মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধিসহ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারলে জাতীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদানের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।
পঞ্চম অধ্যায়
হাওরের জনগোষ্ঠীর সম্ভাব্য ঝুঁকির আলোকে সুপারিশমালা
৫.১ সুপারিশমালা
টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র্যের ওপর প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞ এবং নাগরিক সমাজ থেকে প্রাপ্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ মতামত ও পরামর্শ নিচে বিস্তারিতভাবে দেওয়া হলো:
১. নদী ও জলাশয় খনন (ড্রেজিং)
হাওরের প্রধান সমস্যা হলো পলি জমে নদী ও খালের গভীরতা কমে যাওয়া।
- নদী খনন: হাওরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত প্রধান নদী ও শাখা নদীগুলো নিয়মিত খনন করা প্রয়োজন যাতে বৃষ্টির পানি দ্রুত সরে যেতে পারে।
- খাল-বিল পুনরুদ্ধার: হারিয়ে যাওয়া খাল ও বিলগুলো পুনরায় খনন করলে পানি ধারণ ক্ষমতা বাড়বে এবং কৃষি জমির জলাবদ্ধতা দূর হবে।
২. বাঁধ নির্মাণ ও সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ
অকাল বন্যা থেকে বোরো ফসল রক্ষায় বাঁধের ভূমিকা অপরিসীম।
- সঠিক সময়ে কাজ শেষ করা: ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা এবং কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করা জরুরি।
- দুর্নীতি রোধ: বাঁধ নির্মাণে স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং স্থানীয় কৃষকদের তদারকিতে অন্তর্ভুক্ত করা কার্যকর সমাধান হতে পারে।
৩. কৃষি ও জীবিকা বহুমুখীকরণ
শুধুমাত্র একক ফসল (বোরো ধান) ওপর নির্ভরশীলতা টাঙ্গুয়ার হাওরবাসীর ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
- স্বল্পমেয়াদী জাতের ধান: অকাল বন্যার আগেই কাটা যায় এমন দ্রুত বর্ধনশীল ও বন্যা সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন ও চাষে উৎসাহ প্রদান করা।
- ফসলের বৈচিত্র্য: আগাম বন্যার ঝুঁকি কমাতে স্বল্প মেয়াদী এবং দুর্যোগ সহনশীল ধানের জাত চাষে উৎসাহিত করা। এ ছাড়া খাঁচায় মাছ চাষ (cage aquaculture) এবং বসতবাড়িতে সবজি চাষের মতো বিকল্প কৃষিপদ্ধতি গ্রহণ করা যেতে পারে।
- বিকল্প কর্মসংস্থান: দুর্যোগের সময় যখন হাওরে মাছ ধরা বা কৃষি কাজ বন্ধ থাকে, তখন স্থানীয়দের জন্য সেলাই, হাঁস-মুরগি পালন বা হস্তশিল্পের মতো বিকল্প আয়ের উৎস তৈরি করা প্রয়োজন।
- প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা নিষিদ্ধ: মাছের স্বাভাবিক বংশবিস্তারের জন্য নির্দিষ্ট প্রজনন মৌসুমে হাওরে মাছ ধরার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা বা ‘লকডাউন’ কার্যকর করা উচিত।
- মাছের অভয়াশ্রম বৃদ্ধি: দুর্যোগের সময় মাছের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য স্থায়ী ও মৌসুমী অভয়াশ্রমের সংখ্যা বাড়ানো এবং সেগুলো কঠোরভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
৪. অবকাঠামো ও যোগাযোগ উন্নয়ন
- উড়াল সড়ক বা সাবমার্সিবল রোড: হাওরের পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত না করে পরিবেশবান্ধব যোগাযোগ ব্যবস্থা (যেমন- উড়াল সড়ক) গড়ে তোলা উচিত।
- আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন: বন্যার সময় মানুষের জীবন ও গবাদি পশু রক্ষায় পর্যাপ্ত উঁচু স্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা জরুরি।
৫. সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা ও সুশাসন
- মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন: সরকার কর্তৃক গৃহীত হাওর মহাপরিকল্পনা (Master Plan) আধুনিকায়ন এবং তার যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
- আঞ্চলিক ও স্থানীয় সমন্বয়: পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, কৃষি বিভাগ এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বিত কাজের মাধ্যমে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব।
৬. বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ ও নীতি নির্ধারণ
- ডিজিটাল মনিটরিং: আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে হাওরের পানির উচ্চতা, জীববৈচিত্র্যের পরিবর্তন এবং পলি জমার হার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা。
- পর্যটন নিয়ন্ত্রণ: অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন হাওরের পরিবেশের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। তাই পরিবেশবান্ধব ও দায়িত্বশীল পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন যাতে পর্যটন থেকে প্রাপ্ত আয় পুনরায় হাওর সংরক্ষণে ব্যয় করা যায়।
টাঙ্গুয়ার হাওর কেবল একটি জলাভূমি নয়, এটি একটি রামসার সাইট (Ramsar Site) হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাই দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের কারিগরি সহযোগিতা এবং স্থানীয়দের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ অপরিহার্য।
৫.২ উপসংহার
হাওর অঞ্চলের জীবন যাত্রা একটি চলমান প্রক্রিয়া যেখানে হাওরের প্রাকৃতিক এবং মানবসৃষ্ট পরিবেশ, মানুষের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড, পেশাগত ভিন্নতা, উড্ভিদ-প্রাণীর বৈচিত্র্যতা, কৃষি এবং মৎস্য শিকারের কৌশল, উচ্চতার ভিত্তিতে ভূমি ব্যবহার, প্রাকৃতিক এবং জৈবিক আপদ সহ সকল ধরনের কর্মকান্ড বিরাজমান। টাঙ্গুয়ার হাওর অঞ্চলের মানুষের পেশা থেকে শুরু করে সকল ধরনের বৈচিত্র্যতার পাশাপাশি বিভিন্ন সমস্যা ও ঝুঁকির সম্মুখীন হতে হয়। কিছু সমস্যা এবং ঝুঁকি শুধুমাত্র হাওর অঞ্চলেই বিদ্যমান । বিভিন্ন ধরনের এসব সমস্যা ও ঝুঁকির জন্য হাওরের জনগোষ্ঠী শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ইত্যাদি স্বাভাবিক জীবন যাত্রা বিপর্যস্ত হয়। অত্র গবেষণায় হাওরের জনগোষ্ঠীর জীবন যাত্রার মান সম্পর্কে আলোচনার সময় যেসকল সমস্যা এবং ঝুঁকি দেখানো হয়েছে সেসকল সমস্যা এবং ঝুঁকির সম্ভব্য সমাধান আলোচনা করা হয়েছে। যেহেতু টাঙ্গুয়ার হাওর সুনামগঞ্জ তথা বাংলাদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল সেক্ষেত্রে হাওরের জনগোষ্ঠীর জীবন যাত্রার মান সঠিকভাবে নিশ্চিত করনে অত্র গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
৫.৩ সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি
১। হক, মুহাম্মদ এনামূল , শিবপ্রসরন লাহিড়ী, স্বরোচিষ সরকার সম্পাদক। “হ“। বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান (প্রিন্ট) (জানুয়ারি ২০০২ খ্রিঃ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলা একাডেমী। পৃষ্ঠা ১২২৪।
২। আখতার, কাজী রোজানা (২০০০)। “হাকালুকি হাওর” কালী প্রসন্ন দাস, মোস্তফা সেলিম । বড়লেখা: অতীত ও বর্তমান (প্রিন্ট) (ফেকয়ারি ২১, ২০০০ খিস্টাব্দ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ রাইটার্স গিল্ড । পৃষ্ঠা ১৭৯-১৯২
৩। করিম, ফওজুল (তারা) ২০০০ “বড়লেখা সম্পর্কে একটি প্রামাণ্যচিত্র“। কালী প্রসন্ন দাস, মোস্তফা সেলিম। বড়লেখা:অতীত ও বতর্মান, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০০০ খ্রিষ্টাব্দ সংস্করণ। ঢাকা: বাংলাদেশ রাইটার্স গিন্ড। পৃষ্ঠা ৩৮-৩৯।
৪। পরিযায়ী পাখির চারণভূমি: নাম যার টাঙ্গুয়ার হাওর, রেজা খান (বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ), সাপ্তাহিক ক্রোড়পত্র অন্য আলো, দৈনিক প্রথম আলো, ঢাকা থেকে প্রকাশিত; প্রকাশকাল: ১৩ জানুয়ারি ২০১২; পরিদর্শনের তারিখ: ১৩ জানুয়ারি ২০১২ খিস্টান্দ।
৪। ইতিহাস-এঁতিহ্যঃ “নয়কুড়ি কান্দার ছয়কুড়ি বিল“, শাহ দিদারুল আলম; রকমারি, দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন; পৃষ্ঠা ৫; ৩ ফেকয়ারি ২০১১; পরিদশর্নের তারিখ: ৩ ফে্ুয়ারি ২০১১।
৫। রহমান, আশীষ-উর (২২ জুলাই ২০১০) “হাওরে মহাশোল” গেয়েব। দৈনিক প্রথম আলো, ঢাকা। সংগ্রহের তারিখঃ অক্টোবর ৬, ২০১০ ।
৬। https://www.climatecentral.org
৭। https://www.researchgate.net
১১। https://www.thedailystar.net
১২। https://www.prothomalo.com
১৬। https://www.quora.com/Does-Bangladesh-really-have-six-seasons
১৭। https://www.ntvbd.com/travel/106
১৮। https://www.thedailystar.net/frontpage/no-school-haor-kids-over-month-1399045
১৯। http://offroadbangladesh.com/places/tanguar-haor
২০। http://amadersunamganj.com/2018/03/15
২১। https://www.prothomalo.com/bangladesh/article
২২। http://www.ais.gov.bd/site/view/krishi_kotha_details
২৩। http://www.ais.gov.bd/site/view/krishi_kotha_details
২৪। Haque, M. I., & Basak, R. (2017). Land cover change detection using GIS and remote sensing techniques: A spatio-temporal study on Tanguar Haor, Sunamganj, Bangladesh. The Egyptian Journal of Remote Sensing and Space Science, 20(2), 251-263.
২৫।. Bevanger, K., Datta, A. K., Eid, A. T., & Shirin, M. (2001). Tanguar Haor Wetland Biodiversity Conservation Project- an Appraisal. NINA Project Report, 16, 37.
২৬। Uddin, M., Miah, M., Afrad, M., Mehraj, H., & Mandal, M. (2015). Land use change and its impact on ecosystem services, livelihood in Tanguar haor wetland of Bangladesh. Sci. Agric, 12, 78-88.
২৭। Talukdar, Nixon (2012). “Tanguar Haor”. In Islam, Sirajul; Jamal, Ahmed A. (eds.). Banglapedia: National Encyclopedia of Bangladesh (Second ed.). Asiatic Society of Bangladesh.
২৮। Mahalder B, Mustafa MG. Introduction to Fish Species Diversity: Sunamganj Haor Region within CBRMP’s Working Area. Community Based Resource Management Project-LGED, Worldfish, Dhaka, Bangladesh. 2013, 75.
২৯। A Directory of Aisan Wetlands: Bangladesh, A. W. Akhand; IUCN, Gland, Switzerland and Cambridge; p. 541-581
৩০। Wolman, M. G., & Miller, J. P. (1960). Magnitude and frequency of forces in geomorphic processes. The Journal of Geology, 68(1), 54-74.
পরিশিষ্ট
পরিশিষ্ট-১: জরিপ প্রশ্নমালা
“হাওরের জীববৈচিত্র্যের উপর প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাবঃ টাঙ্গুয়ার হাওরের উপর একটি সমীক্ষা”
নির্দেশনা: অনুগ্রহ করে নিচের প্রশ্নুপ্তলোর যথাযথ উত্তর দিন। আপনার তথ্য শুধুমাত্র গবেষণার উদ্দেশ্যে
ব্যবহৃত হবে এবং গোপন রাখা হবে।
ক. ব্যক্তিগত তথ্য
১. নাম :
২. বয়স: ১৮-২৫ ২৬-৩৫ ৩৬-৫০ ৫০ এর বেশি
৩. লিঙ্গ: পুরুষ নারী হিজড়া
৪. শিক্ষাগত যোগ্যতা:
প্রাথমিক মাধ্যমিক উচ্চ মাধ্যমিক স্নাতক শিক্ষা নেই
৫. পেশা:
কৃষক দিনমজুর ব্যবসায়ী জেলে মাঝি চাকুরীজীবী গৃহিণী অন্যন্য
৬. আপনি কত বছর ধরে এই এলাকায় বসবাস করছেন?
০১-০৫ ০৬-১০ ১০ বছরের বেশি
খ : প্রাকৃতিক দুর্যোগের ধরণ ও তীব্রতা
৭. আপনি গত ১০ বছরে টাঙ্গুয়ার হাওরে কোন ধরণের প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেশি হতে দেখেছেন?
আগাম বন্যা (Flash Flood)
শিলাবৃষ্টি
খরা বা পানির স্তর অতিরিক্ত কমে যাওয়া
পাহাড়ি ঢল ও পলি জমা
৮. আপনার মতে, এই দুর্যোগগুলোর তীব্রতা কি আগের চেয়ে বেড়েছে?
হ্যাঁ না আগের মতই
৯. দুর্যোগের সময় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রধান খাদ্য বা জ্বালানি সংকট কেমন হয়?
গ: জীববৈচিত্র্যের ওপর প্রভাবঃ
৯. দুর্যোগের কারণে হাওরের মাছের প্রজাতি বা পরিমাণের কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করেছেন কি?
মাছের সংখ্যা কমে গেছে
নির্দিষ্ট কিছু প্রজাতি বিলুপ্ত হয়েছে (যেমন: মহাশোল বা অন্যান্য দেশি মাছ)
মাছের আকার ছোট হয়ে গেছে
১০. পাহাড়ি ঢল বা পলির কারণে মাছের প্রজনন ক্ষেত্র (বিল/কুড়ি) ভরাট হওয়ার বিষয়ে আপনার
পর্যবেক্ষণ কী?
১১. আগাম বন্যার ফলে অতিথি পাখি বা স্থানীয় পাখির আবাসস্থলে কী ধরণের প্রভাব পড়ে?
পাখিরা আবাস্থল ত্যাগ করে
পাখির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পায়
১২. জলজ উদ্ভিদ ও হিজল-করচ বাগানের ওপর দুর্যোগের প্রভাব কেমন?
গাছপালা মরে যাচ্ছে
নতুন চারা গজাতে বাধা পাচ্ছে
ঘ: আর্থ-সামাজিক ও অভিযোজন কৌশল
১৩. দুর্যোগের ফলে জীববৈচিত্র্য নষ্ট হওয়ায় আপনার আয়ের ওপর কী প্রভাব পড়েছে?
১৪. জীববৈচিত্র্য রক্ষায় স্থানীয়ভাবে আপনারা কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেন কি?
অভয়াশ্রম রক্ষা
নির্দিষ্ট সময়ে মাছ ধরা বন্ধ রাখা
১৫. সরকারি বা বেসরকারি সংস্থা থেকে দুর্যোগ পরবর্তী জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারে কী ধরণের সহায়তা পান?
ঙ: মতামত ও সুপারিশ
১৬. টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আপনার প্রধান সুপারিশ কী?
অবৈধ মৎস্য আহরণ বন্ধ করা,
পলি অপসারণ
পর্যটন নিয়ন্ত্রণ
পরিশিষ্ট -২
আলোকচিত্র

চিত্র-১৩: হাওরে অবস্থিত একটি শ্মশানঘাট

চিত্র-১৪: বর্তমানে টাঙ্গুয়ার হাওরের যেখানে গরু ছাগলের চরনভূমি।
চিত্র-১৫: টাঙ্গুয়ার হাওরে অবস্থিত একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বর্ষাকালে ৬ ফুট পানি চলে আসে

চিত্র-১৬: টাঙ্গুয়ার হাওরে অবস্থিত একটি কবরস্থান।
টাঙ্গুয়ার হাওর এর পাশে অবস্থিত একটি কবর স্থান।
চিত্র-১৭: টাঙ্গুয়ার হাওরের দৃশ্য
চিত্র-১৮: টাঙ্গুয়ার হাওরের দৃশ্য
গ্রন্থস্বত্ব:
মো.মিজানুর রহমান
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসার
মধ্যনগর,সুনামগঞ্জ।
ফোন: ০১৭২৯৪৯৫৯৭৯
mizan.pio@gmail.com
বাংলাদেশ সময়: ১৫:০৪:০২ ● ১৮৫ বার পঠিত
পাঠকের মন্তব্য
(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)-
হাওরের জীববৈচিত্র্যের উপর প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাবঃ টাঙ্গুয়ার হাওরের উপর একটি সমীক্ষা: মো. মিজানুর রহমান
বুধবার ● ২৯ জুলাই ২০২৬ -
মাইক্রোপ্লাস্টিকের তালিকায় চিনিও বাদ নেই !
বুধবার ● ২৯ জুলাই ২০২৬ -
ড্রোন অনুপ্রবেশে নিরাপত্তার ঝুকি !
বুধবার ● ২৯ জুলাই ২০২৬ -
কে এই রবিন হুড স্বন্দীপে ?
বুধবার ● ২৯ জুলাই ২০২৬ -
হাম-রুবেলার ভ্যাকসিন নিয়ে কারসাজি
বুধবার ● ২৯ জুলাই ২০২৬ -
মধ্যনগরে স্বাস্থ্যসেবা যেন ‘অমাবস্যার চাঁদ’
মঙ্গলবার ● ২৮ জুলাই ২০২৬ -
টনপ্রতি ১০ ডলার কমে ইউরিয়া দিতে চায় রাশিয়া
মঙ্গলবার ● ২৮ জুলাই ২০২৬ -
জনতার এম শহীদ
মঙ্গলবার ● ২৮ জুলাই ২০২৬ -
জাপা নেতার চেন্নাই গমন
রবিবার ● ২৬ জুলাই ২০২৬ -
যুক্তরাষ্ট্র হতে ওয়েবসাইটগুলোতে নিষেধাজ্ঞা !
শুক্রবার ● ২৪ জুলাই ২০২৬
-
হাওরের জীববৈচিত্র্যের উপর প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাবঃ টাঙ্গুয়ার হাওরের উপর একটি সমীক্ষা: মো. মিজানুর রহমান
বুধবার ● ২৯ জুলাই ২০২৬ -
হাম-রুবেলার ভ্যাকসিন নিয়ে কারসাজি
বুধবার ● ২৯ জুলাই ২০২৬ -
কে এই রবিন হুড স্বন্দীপে ?
বুধবার ● ২৯ জুলাই ২০২৬ -
জনতার এম শহীদ
মঙ্গলবার ● ২৮ জুলাই ২০২৬ -
মধ্যনগরে স্বাস্থ্যসেবা যেন ‘অমাবস্যার চাঁদ’
মঙ্গলবার ● ২৮ জুলাই ২০২৬ -
ড্রোন অনুপ্রবেশে নিরাপত্তার ঝুকি !
বুধবার ● ২৯ জুলাই ২০২৬ -
মাইক্রোপ্লাস্টিকের তালিকায় চিনিও বাদ নেই !
বুধবার ● ২৯ জুলাই ২০২৬ -
টনপ্রতি ১০ ডলার কমে ইউরিয়া দিতে চায় রাশিয়া
মঙ্গলবার ● ২৮ জুলাই ২০২৬
আর্কাইভ
Head of Program: Dr. Bongoshia
News Room: +8801996534724, Email: [email protected] , [email protected]



.gif)