বাংলার স্বভাব কবি, চারণ কবি , মরমী তথা বাউল কবিদের কথা: পর্ব-৩
মরমীবাদ-
”বাউলবাড়ীর” দ্বারস্থ হয়ে কৃতজ্ঞতাসহ মরমীবাদ নিয়ে লিখছি দু’চারটি কথা।
”মরমী বলতে অস্পষ্ট গূঢ় অর্থপূর্ণ গুপ্তরহস্যমন্ডিত হৃদয় দ্বারা অনুভূত বিষয় বুঝায়। স্রষ্টার সাথে প্রত্যক্ষ সংযোগ স্থাপনে সক্ষম ব্যক্তিকেও মরমী বলা হয়। অর্থাৎ পরম সত্যের সাথে যার মরম বা অন্তঃকরণ সংযুক্ত, তিনিই মরমী এবং দার্শনিক প্রমাণাদি দ্বারা নির্ণীত তাঁর সিদ্ধান্ত বা মানসত্ত মরমীবাদ নামে অভিহিত। আঞ্চলিক ভাষায় মরমী অর্থে মরমীয়া কথাটি প্রচলিত। মরমীয়া সেখানে পবিত্র হৃদয়বিশিষ্ট সমবেদনা অনুমহাপ্রাণ ব্যক্তির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য জ্ঞাপক শব্দ। তবু মনে হয় অতীন্দ্রিয় এই শব্দটি দ্বারা মরমী শব্দটি অধিকতর তাৎপর্যময় হয়ে উঠে। কেননা ইন্দ্রিয়ের অগম্য বা জ্ঞানের অবিষয়ীভূত যা কিছু তাই অতীন্দ্রিয়; মর্ম দ্বারা অনুভূত তত্ত্ব বরে মরমীবাদ ইন্দ্রিয়াতীত অব্যক্ত রহস্যলোকের গূহ্যবস্তু জ্ঞানাতীত চিন্তাতীত আত্মিক বিষয়। সুতরাং প্রেমমিশ্রিত ধ্যান ও স্বঙ্গা বা বধি দ্বারা পরম সত্তার সাথে যোগাযোগ স্থাপনের অভিজ্ঞতাই মরমীবাদ”।
মরমীবাদে মজিছে যারা , তারা বিজ্ঞানের জানাকেও তুচ্ছ মনে করে থাকেন। তাদের ধারণf আরও ব্যপক। সে অনুসারে তাঁরা বিশ্বাস করেন যে, অন্তরের গভীর উপলব্ধ সত্য-শিহরণের অনুভূতি বোধী ব্যাতিত জ্ঞান, বুদ্ধি , মেধা ও প্রজ্ঞা দ্বারা বিচার্য নয়। একমাত্র বোধিদৃষ্টির ফলেই সমুচ্চ অনন্ত সত্তার সাথে শান্ত মানব-সত্তার বিভেদ তিরোহিত হয়। সীমাবদ্ধ জ্ঞানে শ্রেয়-প্রেয় সেই অসীমকে জানা অসম্ভব। বিজ্ঞান এ জানাকে সম্ভব করতে পারে না। কারণ জানা এবং হওয়া অভিন্ন–অচ্ছেদ্দ হয়ে একটি চরমাবস্থা সৃষ্টি করে। ধ্যানদৃষ্টিসম্ভূত সে চরমাবস্থার কথা বিজ্ঞান ভাবতেই পারে না। যোগী যা ধ্যানে এবং কবি যা ভাবে পেয়ে থাকেন, সেই অহংবিলুপ্ত তন্ময়াবস্থা মরমীর ব্যাক্তিগত অনুভূতি। শ্রুতি যাকে পরাবিদ্যা বলে এটা আসলে তাই। মরমীবাদের চূড়ান্ত তাৎপর্য এই। দৃষ্টিবহির্ভূত অতীন্দ্রিয় জগত এবং শাশ্বত আধাত্ম প্রেম চিরন্তন। মরমীরা এ চিন্তনবাদে আস্থাশীল । এই আস্থা অর্জনের প্রধানতম অবলম্বন হচ্ছে আত্মা। আত্মাই মরমীবাদের প্রধান উৎস। ধর্মের বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান নয় হৃদয়ের প্রেমই স্রষ্টাকে লাভ করার মূল উপায়। এ প্রেমানুভূতি থেকে মরমীবাদের ধারনা প্রবাহের সৃষ্টি হয়েছে।
তাই বলা যায় যে, যে সকল কবি তাঁদের কাব্যে বা গানে গূঢ় আধ্যাতিকতা, স্রষ্টাপ্রেম, আত্মোপলব্দি এবং মানবতাবাদী দর্শনের চর্চা করেন তাঁদের মরমী কবি বলা হয়। জাগতিক মোহ ত্যাগ করে ঐশ্বরিক সত্যের সন্ধান করাই তাঁদের কবিতার প্রধান উপজীব্য। বাংলা সাহিত্যে “ মরমী কবি” বলতে সাধারণত দেওয়ান হাছন রাজাকেও বিশেষ ভাবে বুঝানো হয়। এছাড়াও লালন শাহ, জালাল উদ্দিন রুমি প্রমুখ বিশ্ববিখ্যাত মরমী কবি রয়েছেন।
এসব আলোচনার প্রেক্ষিতে তাঁদের যেসব বৈশিষ্ট পাওয়া যায়, তাহলো-
আত্মোপলব্দি: আত্মোপলব্দি ও আধ্যাত্মবাদ, তাঁরা স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যেকার গভীর সম্পর্ক এবং নিজের আত্মাকে জানার উপর জোর দেন।
প্রতীকী ভাষা: মরমী গানে তাঁরা পার্থিব রূপক বা উপমা ব্যবহার করে আধ্যাত্মিক সত্য প্রকাশ করে থাকেন।
মানবতা: ধর্ম , বর্ণ, বা লিঙ্গের উর্ধে উঠে মানুষকে ভালবাসার শিক্ষা দেওয়া তাঁদের গানের মুল মন্ত্র থাকে।
মরমী: মরমী বা মরমীয়া আধ্যাত্মিক অতীন্দ্রিয় বা গূঢ় রহস্যময় একটি বিষয়। এটি মূলত সেই গভীর অনুভূতি বা তত্বকে বুঝায় যা সাধারণ ইন্দ্রিয় বা বাহ্যিক জ্ঞানের অতীত এবং কেবল অন্তরের উপলব্দি বা হৃদয় দিয়ে বুঝতে হয়-এমন বিষয়। মরমী দর্শন তাই স্রষ্টার সাথে সরাসরি আত্মিক বা আধ্যাত্মিক সম্পর্ক স্থাপনকে বুঝায়।
মরমী সাহিত্য তাই বাউল ও সুফী সাধকদের গান বা কবিতা প্রকাশকে বুঝায়, যা পার্থিব বিষয়ের আড়ালে আধ্যাত্মিক বা ঐশ্বরিক সত্য প্রকাশ করতে চেষ্টা করে। অর্থাৎ সংক্ষেপে বলা যায় যে, মরমী সাধক কবি তারাই, যাদের স্বভাবে রয়েছে মর্মস্পর্শী বা দরদী হৃদয়, এবং যাঁদের রয়েছে অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল একটি মন। ( চলবে )