
নোয়াখালী প্রতিনিধি:
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার বন কর্মকর্তা সামছু উদ্দিন বন অধিদফতরে এখন এক আতঙ্কের নাম। তার বিরুদ্ধে অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ উঠে এসেছে । বিগত ১৭ বছর বন অধিদফতর একাধিকবার তার দুর্নীতি চিহ্নিত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চিঠি পাঠালেও রহস্যজনক কারনে তার ব্যবস্থা নেয়া হয়নি । এমনকি ২০১৯ সালে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল হলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
তবে সর্বশেষ তার বিরুদ্ধে গত ৮ আগস্ট বেগমগঞ্জ উপজেলার বেতুয়ার বাজার গোপালপুর ইউনিয়নের মমিনুল ইসলাম পিজন স্বাক্ষরিত আবেদন নোয়াখালীর দুর্নীতি দমন কমিশনে জমা দিয়েছেন।
বন কর্মকর্তা শামসুদ্দিনের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পূর্বে বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় তার জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও অনিয়মের অভিযোগে একাধিক সংবাদ প্রকাশিত হয়। এসব প্রকাশিত সংবাদের জেরে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তৎকালীন নোয়াখালী উপকূলীয় বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবু ইউসুফ স্বাক্ষরিত চিঠি বন অধিদপ্তরে পাঠান।তৎকালীন সরকার পতনের পর বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যায়। লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, উপজেলার কালিকাপুর বাজার এলাকায় তার পৈত্রিক ভিটা । ১৯৯০ সাল থেকে কর্মরত আছেন নোয়াখালীর বিভিন্ন উপজেলার বন কর্মকর্তা হিসেবে । বর্তমানে তিনি বেগমগঞ্জ উপজেলার বন কর্মকর্তার পাশাপাশি ভারপ্রাপ্ত হিসেবে রয়েছেন সেনবাগের বন কর্মকর্তার দায়িত্বে। সাধারণত সরকারি কর্মকর্তাদের নিজ জেলায় চাকরির সুযোগ না থাকলেও সামছুদ্দিনের বেলায় যেন ভিন্ন নিয়ম।
অনুসন্ধানে জানা যায় , সামছুদ্দিন নিজ এলাকা কালিকাপুরে কিনেছেন ২২ ডিসিম জমি। বগাদিয়া-কালিকাপুর বাজার-সংলগ্ন সড়কের পাশে কিনেছেন প্রায় ৩০ ডিসিম জমি, যার বর্তমান মূল্য কয়েক কোটি টাকা। সেই জমির রাস্তা তৈরি করতে করেছেন সরকারি খাল দখল। কালিকাপুরের পৈত্রিক জমিতে তুলেছেন আলিশান দ্বিতল ভবন। বসবাস করছেন মাইজদী শহরের দীঘিরপাড় আবাসিক এলাকার বিলাসবহুল আপন নিবাস নামে একটি ফ্ল্যাটে। আর সেই ফ্ল্যাটের পাশেই কিনেছেন কয়েক কোটি টাকা মূল্যের প্লট। তবে ওই জমিতে ব্যবহার করেছেন নিজের শ্বশুরের নামে ব্যানার।
জানা যায়, গত ২০২৩ সালের মে মাসে সোনাইমুড়ীর বজরা ইউনিয়নের ছনগাঁও এলাকার আব্দুল মতিনের ছেলে নূর নবী শিপন ও আব্দুল গফুরের ছেলে শাহ আলম সামাজিক বনায়নের প্রায় ২০টি গাছ কেটে ফেলেন। অবৈধভাবে গাছ কাটার বিষয়টি ওই এলাকার সামাজিক বনায়নের সভাপতি আবুল কাশেম সোনাইমুড়ীর ভারপ্রাপ্ত বন কর্মকর্তা এ এস এম সামছুদ্দিন আহমেদকে জানান ।
পরবর্তী সময়ে তিনি অবৈধভাবে গাছ কর্তনকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে টাকার বিনিময়ে ঘটনাটি ধামাচাপা দেন। এ ঘটনার বিষয়ে বনপ্রহরী লিপন বলেন, ওখানে প্রায় ২০টি গাছ কাটা হয়। পরের দিন সামছুদ্দিন স্যার আমাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে শিপনকে বকাবকি ঘটনা প্রকাশ না করার জন্য হুমকি দেয় অন্যথায় মামলার ভয় দেখান।
পরে বদলকোটের জনৈক এমপির শালা বাহারসহ অন্য নেতাদের ধরে সবকিছু ধামাচাপা দেওয়া হয়।
জানা যায়, গত ২০২৩ সালের আগস্ট মাসে সেনবাগের কাদরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন ভূঁইয়ার নির্দেশে হিজলী গ্রামের সামাজিক বনায়নের প্রায় ৫০টি গাছ কেটে ফেলেন ইউপি মেম্বার পলাশ। বিষয়টি জানতে পেরে সেনবাগ উপজেলার ভারপ্রাপ্ত বন কর্মকর্তাকে জানান ।কিন্তু তিনি গাছ কর্তনকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা না নিয়ে অভিযুক্তদেরকে টাকার বিনিময়ে গাছ দিয়েদেন । সামছুদ্দিনের বিরুদ্ধে দায়িত্ব অবহেলা, নিয়ম-বহির্ভূতভাবে সামাজিক বনায়নের গাছ বিক্রির অর্থ আত্মসাৎ, মামলার ভয় দেখিয়ে উৎকোচ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
নোয়াখালী বন বিভাগের এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে তিনি তখন সে সরকারের দলীয় নেতা কর্মীদের হাত করে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা নিয়েছেন। আবার তিনিও ওই দলের নেতাকর্মীদের কে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা পাইয়ে দিয়েছেন। এর কারণে এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা থেকে পুরস্কার। সে পুরস্কারকে পুঁজি করে নোয়াখালী বন বিভাগে দাপট দেখাতেন। কোন সংবাদকর্মী তার বিরুদ্ধে অনিয়ম সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশ করলে শুরু করে দলের নেতাকর্মীদের দিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন। আবার কোন কোন সংবাদকর্মীর বিরুদ্ধে দিয়েছেন মামলা ।
নোয়াখালী বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোল্লা মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন,
তার বিরুদ্ধে আনিত অনিয়মের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে । নোয়াখালী দুর্নীতি দমন কমিশনের উপপরিচালক ফারুক আহমেদ বলেন, বন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ পেয়েছেন। ওই অভিযোগে অনিয়ম ও জ্ঞাত আয় সম্পদ অর্জনের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্ত করার পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে বেগমগঞ্জ বন কর্মকর্তা শামসুদ্দিন উক্ত অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করেননি মুঠোফোনে।