
বাংলার স্বভাব কবি, চারণ কবি , মরমী তথা বাউল কবিদের কথা: পর্ব-৫
মরমীবাদ-
বাউল গানের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হলো ফকির লালনের সঙ্গীত। তাই আবুল আহসান চৌধুরীর সম্পাদনায় প্রকাশিত “ লালনসমগ্র” থেকে কিছু লেখা তুলে ধরছি।
বাউলের কোন শাস্ত্রগ্রন্থ নেই। গানেই এই সম্প্রদায়ের সাধন-ভজন আচার –দর্শনের পরিচয় নিহিত। লালন তাঁর গানেই বাউলসাধনার গুপ্ত-রহস্যের কথা বলেছেন। লালন নিজে লেখাপড়া জানতেন না। কিন্তু তিনি বাউলসাধনার উচ্চস্তরে পৌঁছেছিলেন। তাঁর রচিত গান শুনে তাঁকে পরম পন্ডিত বলে মনে হয়।
বাউলগান বাংলার একটি প্রধান লৌকিক ধর্ম-সম্প্রদায়ের সাধনসঙ্গীত। তাঁদের আধ্যাত্ম-সাধনার গূঢ়-গুহ্য পদ্ধতি কেবল দীক্ষিত শিষ্য-সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রচারের উদ্দেশ্যেই এই গানের জন্ম। শিল্প-সৃষ্টির সচেতন প্রয়াস এখানে অনুপস্থিত। লালনও তাই বিশুদ্ধ শিল্প-প্রেরণায় গান রচনা করেননি, বিশেষ উদ্দেশ্য সংলগ্ন হয়েই তাঁর গানের জন্ম। তবে উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনকে অতিক্রম করে লালনের গান অনায়াসে শিল্পের সাজানো বাগানে প্রবেশ করেছে স্বমহিমায়। লালনের গান তাই একাধারে সাধনসঙ্গীত,দর্শনকথা ও শিল্পশোভিত কাব্যবাণী। তত্ত্বসাহিত্যের ধারায় চর্যাগীতিকা বা বৈষ্ণবপদাবলি সাধনসঙ্গীত হয়েও যেমন উচ্চাঙ্গের শিল্পসাহিত্যের নিদর্শন,তেমনি বাউলগানের শ্রেষ্ঠ নজির লালনের গান সম্পর্কেও এই কথা প্রযোজ্য।
লালন ছিলেন নিরক্ষর, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালাভের সুযোগ হয়নি। কিন্তু তাঁর সঙ্গীতের বাণীর সৌকর্য, সুরের বিস্তার, ভাবের গভীরতা আর শিল্পের নৈপুণ্য লক্ষ্য করে তাঁকে শিক্ষা-বঞ্চিত নিরক্ষর সাধক বলে মানতে দ্বিধা থেকে যায়। প্রকৃতপক্ষে লালন ছিলেন স্বশিক্ষিত, দীর্ঘ শতবর্ষ ধরে ইনি জীবনের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষালাভ করেছেন। ভাবের সীমাবদ্ধতা,বিষয়ের পৌনঃপুনিকতা , উপমা-রূপক-চিত্রকল্পের বৈচিত্রহীনতা ও সুরের গতানুগতিকতা থেকে লালন ফকির বাউল গানকে মুক্তি দিয়েছিলেন। এই বৈশিষ্টের কারণে তাঁর সমকালেই তাঁর গান লৌকিক ভক্তমন্ডলীর গন্ডি অতিক্রম করে শিক্ষিত সুধীসমাজকেও গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। উত্তরকালে লালনের গান দেশের সীমানা অতিক্রম করে বিদেশেও স্থান লাভ করে নিয়েছে। তাঁর গান ব্যতিক্রমী দর্শনচিন্তা ও উচ্চ শিল্পমানের পরিচায়ক বলেই এই অসামান্য সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়েছে। লালনের গান আজ সঙ্গীতসাহিত্যের মর্যাদায় অভিসিক্ত।
লালনের মতো একজন নিরক্ষর গ্রাম্য সাধককবির শিল্প-ভূবনে প্রবেশ করলে তাঁর অসাধারণ প্রতিভা বিষ্ময় জাগায় মনে।
রবীন্দ্রনাথ দৃঢ় প্রত্যয়ে অভিমত পোষণ করেছেন যে, “ এই খাঁটি বাংলায় সকল রকম ছন্দেই কাব্য লেখা সম্ভব। বাঙালির দিবারাত্রির ভাষা’য় রচিত লালনের একটি গানের অংশবিশেষ উধৃত করে মন্তব্য করেছেন “ প্রাকৃত-বাংলাকে গুরুচন্ডালি স্পর্শইকরে না। সাধুছাঁদের ভাষাতেই শব্দের মিশেল সয় না। ছন্দের শাসন লালনের গানকে একটি নিটোল শিল্পে পরিণত করেছে। তাঁর ছন্দবোধ অনুশীলনের ফসল নয়, বরঞ্চ তা তাঁর স্বভাবেরই অন্তর্গত শিল্প-ধারণা থেকে উৎসারিত”।
অলংকার-প্রয়োগের ক্ষেত্রেও লালনের নৈপূণ্য বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। উপমা-রূপক-চিত্রকল্প-উৎপ্রেক্ষা লালনগীতিকে শ্রীমন্ডিত করে তুলেছে। উপমা ও চিত্রকল্পের যুগল ব্যবহার লালনের গানকে কেমন দীপ্তিময় করে তুলেছে তার উদাহরণ নিম্নরূপ-
” মেঘের বিদ্যুৎ মেঘে যেমন
লুকালে না পায় অন্বেষণ
কালারে হারায়ে যেমন
ও রূপ হেরিয়ে স্বপনে।। ( চলবে )