সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে সংসদে তুমুল বিতর্ক

Home Page » জাতীয় » সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে সংসদে তুমুল বিতর্ক
সোমবার ● ১৬ মার্চ ২০২৬


সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে সংসদে তুমুল বিতর্ক

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নটি দেশের রাজনীতিতে অন্যতম ইস্যু হয়ে উঠেছে। সেই প্রেক্ষাপটে জুলাই জাতীয় সনদ। জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুসারে নির্ধারিত সময়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান না হওয়াকে ঘিরে জাতীয় সংসদে তুমুল বিতর্ক হয়েছে। বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করা হয়নি, যা জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অন্যদিকে সরকারি দলের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধানে এ ধরনের পরিষদের কোনো স্বীকৃতি না থাকায় সাংবিধানিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে অধিবেশন আহ্বান করা সম্ভব নয়। ফলে গণভোটের রায়, জুলাই জাতীয় সনদ এবং বিদ্যমান সংবিধানের সীমারেখাতেই এর মধ্যে সমন্বয় কীভাবে হবে, তা নিয়েই সংসদে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে। গতকাল রবিবার জাতীয় সংসদে অনির্ধারিত আলোচনায় সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে এই অনির্ধারিত বিতর্ক হয়। গতকাল রবিবার জাতীয় সংসদে অনির্ধারিত আলোচনায় সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে এই অনির্ধারিত বিতর্ক হয়।

গতকাল বেলা ১১টায় অধিবেশনের শুরুতেই অনির্ধারিত আলোচনার জন্য দাঁড়ান জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষ হলে বিরোধীদলীয় নেতাকে সুযোগ দেওয়া হবে। প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে শফিকুর রহমানকে মাইক দেন স্পিকার। বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে গঠিত এই সংসদ স্বাভাবিকভাবে তার নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় আসেনি। এটি রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে এসেছে। এটি জারি করা হয়েছে ১৩ নভেম্বর ২০২৫।

সংসদে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ পড়ে শোনান বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, এই আদেশ অনুযায়ী নির্বাচনের ফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের কথা রয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে এই অধিবেশন ডাকা হয়নি। আমার উদ্বেগের বিষয়টি এখানে।

জুলাই সনদ আদেশের বিভিন্ন ধারা উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, আদেশে বলা রয়েছে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে। কিন্তু এটি গঠন হয়নি।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, যে পদ্ধতিতে সংসদের অধিবেশন আহ্বান করা হবে, সেই একই পদ্ধতিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে রাষ্ট্রপতি সংসদের অধিবেশন আহ্বান করেছেন।

এবারের সংসদ সদস্যরা দুটি আলাদা ভোটের মাধ্যমে দুটি ‘ক্যাপাসিটিতে’ নির্বাচিত হয়েছেন উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, জুলাই আদেশ অনুযায়ী বিরোধী দলের ৭৭ জন সদস্য সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন। এ আদেশ অনুসারে তারা একই সঙ্গে সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেতে চান। বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, তিনি সরকারি দল থেকে বক্তব্য আশা করছেন।

এরপর বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের জবাব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। শুরুতে তিনি স্পিকারের কাছে প্রশ্ন রাখেন, কোন বিধিতে বিরোধীদলীয় নেতাকে ফ্লোর দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, যদি জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনো মুলতবি প্রস্তাব আনতে হয়, সেটার জন্য বিধি আছে। সেই বিধিতে কোনো নোটিশ তিনি দিয়েছেন কিনা। যদি জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনো সংক্ষিপ্ত আলোচনা করতে হয়, সেই বিষয়ে বিধি ৬৮ অনুসারে কোনো নোটিশ দিয়েছেন কিনা।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংসদের অধিবেশন না থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। কিন্তু সংবিধানের ধারা পরিবর্তন হবে বা সংবিধান পরিবর্তন হবে, এ রকম কোনো বিষয় অধ্যাদেশের মাধ্যমে আসতে পারে না। সেটা জায়েজ নয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কিন্তু এই যে আদেশ (জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ), এই আদেশটা না অধ্যাদেশ, না আইন। মাঝামাঝি জিনিস, সেদিন আমি বলেছিলাম, এটা হয়তো নিউটার জেন্ডার হতে পারে।

এই আদেশটিকে ‘আরোপিত’ আদেশ উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি দুটি কাজ বাদে সব প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে করে থাকেন। একইভাবে এই সংসদের আহ্বানও তিনি করেছেন প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী। কিন্তু সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অস্তিত্ব না থাকায় প্রধানমন্ত্রীও সেটা রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দিতে পারেন না। রাষ্ট্রপতিও সেই অধিবেশন আহ্বান করতে পারেন না বিধায় তা করেননি।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এখন যদি বিরোধী দলের প্রশ্ন অনুসারে রাষ্ট্রপতির জারি করা আদেশটা সাংবিধানিক হয়, সেটা নিয়ে এখানে আলোচনা হতে পারে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ এইটা এবং গণভোট অধ্যাদেশের নির্দিষ্ট অংশ কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না মর্মে আদালত রুল জারি করেছেন। এখানে হয়তো বিচার বিভাগ মতামত দেবে। কিন্তু তাদের মতামত এই সার্বভৌম সংসদের ওপর কখনও বাইন্ডিং (বাধ্যতামূলক) না। কিন্তু সার্বভৌম সংসদ আবার এমন কোনো আইন প্রণয়ন করতে পারে না, যেটা জুডিশিয়ারিতে গিয়ে চ্যালেঞ্জ হয়ে বাতিল হয়ে যাবে বা ভায়োলেশন অব কনস্টিটিউশন হয়ে যাবে। সুতরাং উভয় দিকে লক্ষ্য রেখে জাতির বৃহত্তর স্বার্থে আইনানুগভাবে এবং সাংবিধানিকভাবে যেতে হবে।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এখন যদি বলা হয় যে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে, মানলাম। আমরা নির্বাচিত হয়েছি সাংবিধানিক ভোটে। নির্বাচন কমিশনের দুইটাই এখতিয়ার। একটা হচ্ছে জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠান করা, আরেকটা হচ্ছে রাষ্ট্রপতির নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। এটা হচ্ছে কনস্টিটিউশনাল ম্যান্ডেট, যেটা নির্বাচন কমিশন পালন করতে বাধ্য। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, গণভোটের জন্য আরেকটা আইন হয়েছে। বিএনপিও এটা প্রস্তাব করেছিল। কিন্তু মাঝখানে আদেশটা জারি করে গণভোট দেওয়া হলো চারটা প্রশ্নে। যে প্রশ্নের মধ্যে একটা বিশাল প্রশ্ন জুলাই জাতীয় সনদের সমঝোতা হয়নি। এটা একটা জবরদস্তিমূলক আরোপিত আদেশ করে সেই আদেশের একটা প্রশ্ন গণভোটের মধ্যে দেওয়া হয়। চারটা প্রশ্ন হলেও মানুষ কোন কোন প্রশ্নে হ্যাঁ, কোন কোন প্রশ্নে না বলবে সে বিকল্প ছিল না।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তারপরও গণভোটের রায় যদি বাস্তবায়ন করতে হয়, সংবিধানে আগে সংস্কার আসতে হবে। তিনি বলেন, এই অধিবেশনে সংবিধান সংশোধন বিল আনা যাবে কিনা, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। কারণ ১৩৩টা অধ্যাদেশ এখানে উত্থাপিত হয়েছে প্রথম দিনে। তিনি বলেন, কার্য উপদেষ্টা কমিটিতে যদি সিদ্ধান্ত হয়, সংসদ যদি সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে বাজেট অধিবেশনে সংবিধান সংশোধন বিল উত্থাপন হতে পারে।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আমি কোনো কিছু অস্বীকার করছি না। জনরায়কে সম্মান দিতে হবে, কিন্তু সেটা সাংবিধানিকভাবে দিতে হবে, আইনগতভাবে দিতে হবে। এখানে ইমোশনের কোনো জায়গা নেই। রাষ্ট্র ইমোশন দিয়ে চলে না। রাষ্ট্র চলে সংবিধান দিয়ে, আইন দিয়ে, কানুন দিয়ে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে জাতীয় সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটিতে আলোচনা করার প্রস্তাব দেন বিরোধীদলীয় নেতাকে।

সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, তারা জাতির কাছে অঙ্গীকার করেছেন, জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে তার প্রতিটি শব্দকে তারা সম্মান করেন। কিন্তু জুলাই জাতীয় সনদের বাইরে আরোপিত কোনো আদেশ দিয়ে, কোনো অবৈধ আদেশ দিয়ে সংবিধান সংশোধন করা যায় কিনা, সেটা একটা বিশাল আইনি প্রশ্ন, সাংবিধানিক প্রশ্ন। তিনি সেটা নিয়েও বিতর্ক ও আলোচনার আহ্বান জানান।

পরে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের উদ্দেশে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, আপনি অত্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় উপস্থাপন করেছেন। এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন দ্য স্পট সলিউশন দেওয়া যায় না। এটার জন্য আপনি নোটিশ দেবেন। নোটিশ পাওয়ার পর আমি সিদ্ধান্ত দেব।

অধিবেশন শেষে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশনের বিষয়ে আমরা এখন নোটিশ করব। নোটিশ করে সংসদের ভেতরেই এর সমাধান করতে চাই। কিন্তু কোনো কারণে যদি সংসদে জনগণের এই প্রত্যাশার বাস্তবায়ন না পাই, তখন স্বাভাবিকভাবেই আমাদের রাজপথে আন্দোলনে যেতে হবে। কিন্তু আমরা ওটা চাইনি। আজকে যেহেতু বিষয়টি উত্থাপন করেছি, স্পিকার যেহেতু এটা বিবেচনায় নিয়েছেন, নোটিশ দিতে বলেছেন, সেই ধারাবাহিকতায় এটা চলতে পারে।

সাংবাদিকদের প্রশ্নে জামায়াত আমির বলেন, আমরা এটা কার্য উপদেষ্টার বৈঠকের বিষয় মনে করি না। আমরা মনে করি হাউসের বিষয়, হাউসেই এটার সমাধান হোক। তারপরে যদি তারা (সরকার পক্ষ) কথা উঠান, আমরা তখন দেখব।

এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জুলাই সনদকে অবজ্ঞা করছেন বলে অভিযোগ তুলেছেন এনসিপির আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। অধিবেশন শেষে নাহিদ ইসলাম বলেন, আজ (রবিবার) বিরোধীদলীয় নেতা উত্থাপন করেছিলেন। কিন্তু আলোচনা করতে দেওয়া হয়নি। সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জুলাই সনদকে অবজ্ঞা করেছেন। এটিকে অসাংবিধানিক বলতে পারেন না তিনি। গণভোট মানলে আদেশ মানতে হবে। সরকারি দল গণভোট মানে কিনা, স্পষ্ট জবাব পাওয়া যায়নি।

রাজপথে কর্মসূচি চলমান থাকবে জানিয়ে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, বিএনপি জয় পাওয়ার পর নির্বাচিত বিষয় গায়ের জোরে মানছে না। ’৯১ সালেও বিএনপি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে, যার ফলে তারা বেশি দিন থাকতে পারেননি। নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকারি দল গণভোট বিনষ্টের চেষ্টা করলে জনগণ তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, আমরাও দাঁড়াব।

গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ও গণভোটের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি নবনির্বাচিতরা শপথ নেন। সে দিন বিএনপি থেকে নির্বাচিতরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। অপরদিকে জামায়াত জোটের এমপিরা দুটি শপথ নেন।

বাংলাদেশ সময়: ১০:৩৪:০৭ ● ৭ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ