
জ্ঞান পিপাসু ও বই প্রেমী মানুষের গল্প-২
( পূর্বে প্রকাশিতের পর )
বহুবিধ কাজের ব্যাপক জ্ঞানের অধিকারী এই মাতুব্বর। কিন্তু নিজে নিজেই আয়ত্ব করেছিলেন সব কিছু। ছূতারের কাজ শিখে নিজের টিনের ঘর নিজে তৈরী করেছেন। নৌকা তৈরী করেছেন। মাছ ধরার জাল তৈরী করেছেন। বড়শী তৈরীসহ অন্যান্য উপকরণ তৈরী করে মাছ শিকারে ছিলেন অনন্য। জরীপ কাজের মাধ্যমে এলাকার নির্ভরশীল ব্যক্তি রূপে পরিগণিত হয়ে ছিলেন। বরিশালে নদী ভাঙ্গনে প্রায় প্রতি বছর মাপামাপি করতে হতো। বিরোধ লেগে থাকতো। দু’একটা খুন এবং কিছু আহত হবার পর সবাই সিদ্ধান্ত নিতো যে, আরজ আলী মাতুব্বরের সীমানা নির্ধারন সবাই মেনে নেবেন। এভাবেই জটিল এবং বেশি বিরোধপূর্ণ সব কাজে আরজ আলীর ডাক আসতো। সময় না দিতে পারলে অপেক্ষায় থাকতো সবাই। সুদুরে এমনকি আট দশ মাইল দুরে পর্যন্ত তাকে বোটে করে নিয়ে যেতো। প্রথম প্রথম তিনি কোন টাকা পয়সা নিতেন না। পরে অবশ্য অনেকটা পেশা হিসাবে এটাকে বেছে নেন। প্রথমে প্রতিদিন ১ টাকা তাকে পারিশ্রমিক দিতে হতো। ক্রমান্বয়ে তা বাড়তে বাড়তে ৩০/ টাকায় উন্নীত হয়েছিল।
প্রায় অধিকাংশ ধর্ম সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন তিনি। অনেকের মতো অধ্যাপক সাহেবও তার সাক্ষাৎ প্রত্যাশী ছিলেন। তার লেখা পড়েছেন। সে লেখা সম্পর্কে বলেছেন, “ এক বিঘত চওড়া এবং প্রায় এক হাত লম্বা সদাগর অফিসের হিসাবের খাতার মত দেখতে। আমি ভাঁজ খুলে দেখলাম গ্রাম্য দলিল লেখকের হাতের লেখার মতো হস্তাক্ষর” । কাজী সাহেবের কাছ থেকে অধ্যাপক শামসুল হক সাহেব প্রাপ্ত হন লেখাটি। প্রথমে ভেবেছিলেন ছদ্ম নামে কাজী সাহেব লিখেছেন। কিন্তু কাজী সাহেব তা অস্বীকার করার পর থেকে শামসুল হক সাহেব উদগ্রীব হলেন লেখককে দেখতে। দেখা অবশ্য হয়েছিল। এ বিষয়ে তিনি লিখেছেন, “ একদিন সেই বিরল মুহূর্তটি এলো। অক্টোবরের মাঝামাঝি। ক্লাস সেরে নতুন কলাভবন থেকে পুরনো ভবনের ষ্টাফ রুমে ঢুকে দেখি কাজী সাহেবের সঙ্গে পাশাপাশি ভিন্ন একটি ইজিচেয়ারে বসে আছেন আরেকজন লোক । আমাকে দেখে দু’জনে সোজা হয়ে বসলেন। আমি ভদ্রলোকের চোখের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেলাম। ছবিতে মধুসূদন, বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, ও নজরুল ছাড়া এমন হৃদয়ভেদী চাহনি আর দেখিনি। আমি অবলীলায় বলে ফেললাম, আরজ আলী মাতুব্বর সাহেব তো ? কাজী সাহেব সাড়া দিয়ে বললেন, বলেছিলাম না মাতুব্বর সাহেব, নবীন অধ্যাপক বুদ্ধিদীপ্ত। আগে দেখা না হলে কি হবে, নামটি ঠিকই বলে দিলেন। আমি লজ্জায় মাথা নত করলাম। তিনি মাতুব্বর সাহেবের চেহারার বর্ণনা করলেন এভাবে-
”গায়ের রং কাজী সাহেবের বিপরীত, শালপ্রাংশু দেহ। কোথাও কোন রকম মেদবাহুল্য নেই। চেহারার মধ্যে একটা প্রকৃতিদত্ত মসৃণতা আছে। ঠিক তাঁর লেখার মতো বাহুল্যবর্জিত। বাঙালী মনীষায় রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরীর পর সত্যজিৎ রায় ছাড়া খুব কম লোকের মধ্যে পরিমিতিবোধ আছে” ।
শিক্ষক বিহীন ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাবিহীন লোকটি একদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে বক্তৃতা দিয়ে ছিলেন- ভাবা যায় ? উনিশ’শ পঁচাত্তরের কোন এক সময়ে ঢাকা থেকে ফিরে মাতুব্বর সাহেব খুবই খুশি মনে বললেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক ড. নূরুল ইসলামের উদ্যোগে দর্শন ক্লাসে আত্মা ও প্রাণের ওপর একটি মনোজ্ঞ বক্তৃতার বন্দোবস্ত করেন। এই বক্তৃতা শুনে ছাত্র-ছাত্রীরা খুবই মুগ্ধ হন এবং নানা রকম কঠিন প্রশ্ন করেন। মাতুব্বর সাহেব দক্ষতার সঙ্গে সেসব প্রশ্নের উত্তর দেন। ক্লাসের পর ছাত্র-ছাত্রীরা তাঁকে অভিনন্দনে অভিভুত করেন। ( চলবে )