রঙলেপা- ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরেঃ পর্ব-২৯ স্বপন চক্রবর্তী

Home Page » সাহিত্য » রঙলেপা- ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরেঃ পর্ব-২৯ স্বপন চক্রবর্তী
সোমবার ● ১৮ মে ২০২৬


স্বপন কুমার চক্রবর্তী

জ্ঞান পিপাসু ও বই প্রেমী মানুষের গল্প-২
( পূর্বে প্রকাশিতের পর )
বিষ্ময়কর প্রতিভার অধিকারী আরজ আলীকে জিজ্ঞেস করেন তার জ্ঞান লাভের উৎস সম্পর্কে। উত্তর পাওয়া যায় যথাযথ। তার সময়কার বিশ্বখ্যাত বৈজ্ঞানিকদের তত্ত্ব সহ জীবনের খুঁটিনাটি তিনি অবগত ছিলেন। দার্শনিকদের মধ্যে লিবনিজ, স্ফিনোজা, কান্ট হেগেল মার্কস, এঙ্গেলস, ব্যাডলি, বার্কলি, প্রমুখের দর্শন সম্পর্কে ওয়াকেবহাল ছিলেন। প্রশ্নের উত্তরে সলজ্জ হাসি হেসে তিনি আরও জানান যে, এতসব জানার উৎস হলো বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরী, বি এম কলেজ লাইব্রেরী এবং অধ্যাপক কাজী গোলাম কাদির । তিনি অধ্যাপক শামসুল হককে উদ্দেশ্য করে বলেন, “ সম্প্রতি আপনাদের মতো বন্ধুদের কাছ থেকেও বই নিয়ে কম সাহায্য পাচ্ছি না” । এখানে কাজী গোলাম কাদের সম্পর্কে একটু পরিচয় দেওয়া আবশ্যক মনে করি।
কাজী গোলাম কাদির। কোলকাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন শাস্ত্রের কৃতী ছাত্র। অধ্যাপক হুমায়ুন কবির ও সুরেন্দ্রনাথ দাসগুপ্তের স্নেহধন্য ছাত্র। হাই মাদ্রাসা থেকে পাশ করা। বি এম কলেজে কবি জীবনান্দ দাশ ও ধীরেন্দ্রনাথ চ্যাটার্জীর প্রিয় ছাত্র। উনিশ’শ ছেচল্লিশ সালে এম এ পাশ করে চাখার কলেজে দর্শনের অধ্যাপক হয়ে যোগদান করেন। আটচল্লিশ সালে বি এম কলেজে দর্শনের একটি পদ খালি হয়। তৎকালীন অধ্যক্ষ নীলরতন মুখার্জী নিজের ফার্ষ্ট ক্লাস পাওয়া জামাতাকে চাকুরি না দিয়ে মেধাবী ছাত্র কাজী গোলাম কাদিরকে নিয়োগপত্র দেন। কাজী সাহেব অভিভুত হয়ে স্যারের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। অধ্যক্ষ বললেন, ঘরে গিন্নী, কন্যা এবং জামাতা সবাই নাখোশ। জামাতা এবং কন্যা সমানে কোলকাতার কলেজ গুলোতে দরখাস্ত করছে। চাকুরি পেলে সটকে পড়বে। খামোকা আমার কলেজ সাফার করবে কেন। কাদির শোন, তোমাকে তো বাবা চাকুরি দেইনি- তোমাকে গভীরভাবে পড়াশোনা করার সুযোগ করে দিয়েছি। এই কলেজকে প্রাচ্যের অক্সফোর্ট বলা হয়, এর সুনাম রাখার দায়িত্ব তোমাদের ওপর অর্পিত হবে।
আরজ আলী মাতুব্বর ছিলেন বহুমুখী প্রতিভাধর অনন্য সাধারণ একজন কৃষক। তিনি কোন শিক্ষকের সাহায্য ব্যতিরেকেই অনেক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ছিলেন। নিরামিষাশী ( Vegetarian ) আরজ আলী রন্ধন শিল্পে ছিলেন চমৎকার। রান্নাকে তিনি একটি শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছেন। আবারও অধ্যাপক শামসুল হকের লেখা থেকে উদ্ধৃতি দিতে হয়- “ পিতৃবন্ধু স্থানীয় ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট এবং কাজী সাহেবের হবু শ্বশুরের বড় কন্যার বিয়ে। সন্ধার পর রান্না-বান্নার বিরাট আয়োজন হচ্ছে। রন্ধনশিল্পী আরজ আলী মাতুব্বর। শুনে আমি চমকে উঠলাম। মাতুব্বর সাহেবের সঙ্গে বিশ বছরের সম্পর্ক। কোনদিন আমার বাসায় মাছ-মাংস খাননি। আমি অবাক হওয়াতে কাজী সাহেব এই বলে আমাকে আশ্বস্ত করলেন যে, বিটোফেন কানে শুনতেন না, তবুও পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুরস্রষ্টাদের মধ্যে অনন্য। মাতুব্বর সাহেব মসলাপাতি হাতের আন্দাজে এমনভাবে দিতেন যে, ব্যঞ্জন অত্যন্ত সুস্বাদু হতো। নিজে না খেলে বুঝবেন না। সৌভাগ্যবশত সেই সুযোগও আমার বরিশাল ছাড়ার আগে হয়েছিল। কাজী, আমি এবং আরো দু’জন সহকর্মীসহ বরিশালের ডি সির স্পীটবোট নিয়ে একদিন লামচরি হাজির হলাম। আগে ডালভাত খাওয়ার নিমন্ত্রণ ছিল। এমন তৃপ্তির সঙ্গে অনেকদিন খাইনি। রান্নার মান এবং বৈচিত্র দেখে বিষ্মিত হয়ে গেলাম। মাতুব্বর সাহেবকে ধন্যবাদ দিয়ে অন্দরমহলে এমন সুখাদ্য নির্মানের ধন্যবাদ দিতে বললাম। তিনি মুচকি হেসে বললেন, আপনাদের শুভেচ্ছা অন্দরমহলে পাঠিয়ে দেবো, কিন্তু তা রান্নার জন্য নয়। ও কাজটি আমি স্বহস্তে করেছি। কারণ এ ব্যপারে অন্য কারো ওপর নির্ভর করতে পারিনি” ।
মাতুব্বর সাহেবের সাথে বিভিন্নজন আলোচনায় মিলিত হতেন। কেহ তার বাড়িতে ,কেহ ঢাকায় অথবা অন্য কোথাও । এমনই একদিনের কথা অধ্যাপক সাহেবের লেখায় আছে। আমি এখানে সেই লেখা থেকে কিছু কিছু উল্লেখ করছি শুধু তার সম্পর্কে ধারনার জন্য। “ কাজী সাহেব বর্ণনা করলেন, শামিয়ানার নীচে বসে গল্প করছিলেন সমবয়েসীদের সঙ্গে। একজন ছিপছিপে কালোমতো লোক এসে বললেন, আপনি কি “পেরপেসার” কাজী গোলাম কাদির ? কাজী সাহেব হ্যাঁ-সূচক জবাব দেয়ার পর তিনি বললেন, আপনার বাবা আমার বাল্যবন্ধু, তাঁর মুখে আপনার কথা শুনেছি। আসুন আমরা একপাশে বসে একটু আলাপ-আলোচনা করি। সে আলাপ-আলোচনা চললো পরদিন দশটা পর্যন্ত। অনেক লোক চারপাশে জড়ো হলো । অনেক লোক ক্লান্ত হয়ে চলে গেলো। দশটা পর্যন্ত রুস্তম-সোহরাবের লড়াই চললো। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কামারশালায় তৈরী সূক্ষ্ন এবং ধারালো তলোয়ার বনাম গ্রামের আনাড়ি কামারশালায় তৈরী ভারী লোহার তলোয়ার। সারারাত চললো তত্ত্ব, দর্শন, বিজ্ঞান, ধর্ম, ও সংস্কার নিয়ে তলোয়ারে-তলোয়ারে ঘর্ষণ” । ( চলবে )

বাংলাদেশ সময়: ২০:১৯:৩৬ ● ২৪ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ