
ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব এখন শুধু দুই দেশের সীমান্তে সীমাবদ্ধ নেই। যুদ্ধের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে ইউক্রেনের প্রতিবেশী এবং ন্যাটোর উত্তরাঞ্চলীয় দেশগুলোর আকাশসীমাতেও।ফিনল্যান্ড, এস্তোনিয়া, লাটভিয়া ও লিথুয়ানিয়ায় একের পর এক ড্রোন প্রবেশের ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
এসব ঘটনার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অভিযোগ উঠেছে, ইউক্রেনের সামরিক ড্রোন রাশিয়ার ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থার কারণে পথ হারিয়ে পাশের দেশগুলোর আকাশসীমায় ঢুকে পড়েছে। তবে এসব ঘটনা ন্যাটোর জন্য নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। কারণ এই দেশগুলো সরাসরি রাশিয়ার সীমান্তের কাছে অবস্থিত।
সম্প্রতি ইউক্রেন বাল্টিক সাগর অঞ্চলে রাশিয়ার তেল পরিবহন ও সামরিক সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে দূরপাল্লার হামলা বাড়িয়েছে। এর পর থেকেই আশপাশের দেশগুলোতে ড্রোন অনুপ্রবেশের ঘটনা বেড়েছে।
ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতা তুলে ধরা হলো—
২৫ মার্চ
এস্তোনিয়া ও লাটভিয়া জানায়, দুটি ইউক্রেনীয় সামরিক ড্রোন রাশিয়ার আকাশসীমা অতিক্রম করে তাদের এলাকায় ঢুকে পড়ে। এর মধ্যে একটি এস্তোনিয়ার রাশিয়া সীমান্তের কাছে আউভেরে বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি চিমনিতে আঘাত করে।
অন্যটি লাটভিয়ায় ভেঙে পড়ে। এর আগে লিথুয়ানিয়া জানিয়েছিল, একটি ইউক্রেনীয় ড্রোন তাদের একটি হ্রদে পড়ে গেছে।
২৯-৩০ মার্চ
ফিনল্যান্ডের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে আকাশসীমা লঙ্ঘনের সন্দেহে দেশটির বিমান বাহিনী এফ/এ-১৮ যুদ্ধবিমান পাঠায়। পরে একটি উড়ন্ত বস্তুকে ইউক্রেনের এএন-১৯৬ ড্রোন হিসেবে শনাক্ত করা হয়। ফিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী পেত্তেরি অরপো বলেন, রাশিয়ার শক্তিশালী ইলেকট্রনিক জ্যামিং ব্যবস্থার কারণে ড্রোনগুলো পথ হারিয়ে ফিনল্যান্ডে ঢুকে পড়তে পারে।
৩১ মার্চ
এস্তোনিয়া ও লাটভিয়া রাশিয়া সীমান্তের কাছে সন্দেহজনক ড্রোনের উপস্থিতি শনাক্ত করে। একই দিনে ফিনল্যান্ডের সীমান্তরক্ষীরা দেশটির ভূখণ্ডে একটি ড্রোন খুঁজে পায়। এস্তোনিয়ার তার্তু কাউন্টিতেও ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার করা হয়।
১ এপ্রিল
এস্তোনিয়ার সামরিক বাহিনী জানায়, তাদের শনাক্ত করা ড্রোনগুলো সম্ভবত ইউক্রেন থেকে এসেছিল। তবে এগুলোর লক্ষ্য ছিল রাশিয়ার সামরিক স্থাপনা।
৭ মে
রাশিয়া থেকে আসা বলে সন্দেহ করা দুটি ড্রোন লাটভিয়ায় ঢুকে ভেঙে পড়ে। এর একটি রেজেকনে অঞ্চলের একটি তেল সংরক্ষণাগারে বিস্ফোরিত হয়। এতে চারটি খালি তেলের ট্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর পর লাটভিয়া ও লিথুয়ানিয়া ন্যাটোর কাছে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানায়। ইউক্রেন জানায়, ড্রোনগুলো তাদের ছিল। তবে রাশিয়ার ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থার কারণে সেগুলোর গতিপথ পরিবর্তিত হয়।
১০ মে
লাটভিয়ার প্রধানমন্ত্রী এভিকা সিলিনা অভিযোগ করেন, ড্রোন ঠেকানোর ব্যবস্থা দ্রুত কার্যকর করা হয়নি। এর পর দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন্দ্রিস স্প্রুডস পদত্যাগ করেন।
১৪ মে
প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দল প্রগ্রেসিভস পার্টি সরকারের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে। এর ফলে প্রধানমন্ত্রী সিলিনার জোট সরকার সংকটে পড়ে এবং পরে তিনি পদত্যাগ করেন।
১৫ মে
ফিনল্যান্ডে সন্দেহজনক ড্রোন তৎপরতার কারণে বৃহত্তর হেলসিঙ্কি অঞ্চলের প্রায় ১৮ লাখ মানুষকে সতর্ক করা হয়। তাদের ঘরের ভেতরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। এ সময় যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হয় এবং হেলসিঙ্কি বিমানবন্দরে কিছু সময়ের জন্য বিমান চলাচল বন্ধ রাখা হয়। তবে প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টুব বলেন, ফিনল্যান্ডের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো সামরিক হামলার আশঙ্কা নেই।
১৭-১৮ মে
লিথুয়ানিয়ায় একটি সন্দেহভাজন ইউক্রেনীয় সামরিক ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়। লাটভিয়া ও বেলারুশ সীমান্তের কাছাকাছি ওই এলাকায় পরে বিস্ফোরকও পাওয়া যায়।
১৯ মে
রোমানিয়ার একটি ন্যাটো যুদ্ধবিমান এস্তোনিয়ার আকাশসীমায় ঢুকে পড়া একটি সন্দেহভাজন ড্রোন ধ্বংস করে। ধারণা করা হয়, ড্রোনটি রাশিয়া থেকে এস্তোনিয়ায় প্রবেশ করেছিল। এর পর ইউক্রেন এস্তোনিয়া ও অন্যান্য বাল্টিক মিত্রদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে। কিয়েভ জানায়, রাশিয়ার ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থার কারণে ড্রোনটির পথ পরিবর্তন হয়েছিল। একই সঙ্গে তারা দাবি করে, রাশিয়ায় হামলার জন্য লাটভিয়া বা এস্তোনিয়ার ভূখণ্ড ব্যবহার করা হয়নি।
২০ মে
লিথুয়ানিয়া আকাশপথে সতর্কতা জারি করে। ভিলনিয়ুসের বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। একটি ড্রোন শনাক্ত হওয়ার পর রাজধানীর বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। পার্লামেন্ট ভবনের কর্মকর্তারা নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেন। ট্রেন চলাচল বন্ধ করা হয় এবং স্কুল ও কিন্ডারগার্টেনের শিশুদেরও নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।
২১ মে
লাটভিয়ার সেনাবাহিনী জানায়, তাদের আকাশসীমায় অন্তত একটি ড্রোন শনাক্ত হয়েছে। ন্যাটোর যুদ্ধবিমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ করে। রাশিয়া ও বেলারুশ সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়।
৩ জুন
লাটভিয়া ও এস্তোনিয়া রাতের সময় রাশিয়া সীমান্তবর্তী এলাকায় সতর্কতা জারি করে। বাসিন্দাদের সন্দেহজনক ড্রোন দেখলে দ্রুত নিরাপদ স্থানে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। লাটভিয়া জানায়, পরিস্থিতি মোকাবিলায় ন্যাটোর যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হয়েছে।
৮ জুন
ন্যাটোর একটি ফরাসি যুদ্ধবিমান লাটভিয়ার আকাশসীমায় একটি ড্রোন গুলি করে নামায়।
১০ জুন
ড্রোন অনুপ্রবেশের আশঙ্কায় লাটভিয়ার রাশিয়া সীমান্তবর্তী এলাকায় পর্যটকদের যাতায়াত কমে যায়। দেশটির নতুন প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রিস কুলবার্গস জানান, তিনি ওই এলাকাতেই নিজের গ্রীষ্মকালীন ছুটি কাটাবেন।
২-২৮ জুলাই
রাশিয়া সীমান্তের কাছে ফিনল্যান্ডের উপকূলীয় এলাকায় কয়েক দফা আকাশসীমা ও সমুদ্রপথে চলাচলে সাময়িক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। ২৮ জুলাই ফিনল্যান্ডের সামরিক বাহিনী জানায়, কোনো ড্রোন ভুল করে ওই এলাকায় প্রবেশ করলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই এই সতর্কতা নেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব ঘটনা দেখাচ্ছে যে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব ধীরে ধীরে ন্যাটোর সীমান্তবর্তী এলাকায় পৌঁছে যাচ্ছে। সরাসরি সংঘাত না হলেও ড্রোন অনুপ্রবেশ ও আকাশসীমা লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো ইউরোপের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।