কে এই রবিন হুড স্বন্দীপে ?

Home Page » ইতিহাস » কে এই রবিন হুড স্বন্দীপে ?
বুধবার ● ২৯ জুলাই ২০২৬


কে এই ” রবিন হুড ” স্বন্দীপে ?

সন্দ্বীপ। বঙ্গোপসাগরের দ্বীপটি অবস্থিত মেঘনা নদীর মোহনায়। ভৌগোলিক অবস্থান ও সামরিক কৌশলগত কারণে গত ১৬ ও ১৭ শতকে মোগল ও আরাকানি শাসক এবং পর্তুগিজ জলদস্যুদের কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল দ্বীপটি। তাই এর দখল-পাল্টা দখল নিয়ে লেগে ছিল রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। এসবের মধ্যেও প্রায় ৫০ বছরের মতো দ্বীপটি স্বাধীন রেখে শাসন করেন মোগলদের দলছুট এক যোদ্ধা। যাঁর নাম দিলওয়ার খান। সে সময় স্বাধীন রাজ্যের মতোই নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছিল সন্দ্বীপ।

দিলওয়ার খান বেশি পরিচিত ‘দিলাল রাজা’ নামে। সন্দ্বীপের শেষ স্বাধীন রাজা বলা হয় তাঁকে। শাসক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার পর তিনি দ্বীপে শান্তি–সমৃদ্ধি এনেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। জনশ্রুতি আছে, সে সময় দস্যুতায় লিপ্ত জলদস্যুদের জাহাজ পাকড়াও করে সম্পদ জব্দ করতেন তিনি। আর সে সম্পদ বিলি করতেন দরিদ্র প্রজাদের মধ্যে। যুক্তরাজ্যের শেরউড ফরস্টের লোককথার নায়ক দস্যু ‘রবিন হুডের’ সঙ্গে দিলওয়ারের কর্মকাণ্ডের মিল খুঁজে পেয়েছেন অনেক ইতিহাস লেখক। সে কারণে তাঁকে প্রাচ্যের ‘রবিন হুড’ বলতেও দ্বিধা করেননি তাঁরা। তবে এসব জনশ্রুতির পেছনে অকাট্য কোনো দলিল বা লিখিত বিবরণ পাওয়া যায়নি। এই বীরযোদ্ধাকে নিয়ে নানা কাহিনি এখনো প্রচলিত সন্দ্বীপের বাসিন্দাদের লোকমুখে। দিলাল রাজাকে নিয়ে আলাপের আগে তখনকার সন্দ্বীপ নিয়ে আরেকটু জানা যাক।

বিশ্বের অন্যতম উর্বর দ্বীপ
বর্তমানে চট্টগ্রাম জেলার অধীন থাকা সন্দ্বীপের খ্যাতি একসময় দূরদূরান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল। সাগরদ্বীপটিতে উৎপাদিত হওয়া লবণ বাইরে রপ্তানি করা হতো তখন। লবণ, চাল, শস্য উৎপাদনের পাশাপাশি সুতির কাপড় উৎপাদনের জন্যও পরিচিত ছিল দ্বীপটি।

ক্যাপ্টেন আলেকজান্ডার হ্যামিলটনের এই গ্রন্থটিতে উল্লেখ করা হয়, তখন সন্দ্বীপে মাত্র এক ‘রুপি’ দিয়ে ৫৮০ পাউন্ড চাল অথবা ৬০টি মুরগি পাওয়া যেত। দ্বীপটিতে কাপড়ের দামও ছিল ‘অবিশ্বাস্য রকমের কম’।
দিলাল রাজার ক্ষমতা আরোহণের আগের সময়কার সন্দ্বীপের কিছু বিবরণ পাওয়া যায় ভেনিসীয় পর্যটক সিজার ফ্রেডরিকের ভ্রমণকাহিনিতে। তিনি ছিলেন প্রথম দিকের ইউরোপীয় পরিব্রাজক, যিনি সন্দ্বীপ ভ্রমণ করেছেন। ফ্রেডরিকের ভারত, বাংলা ও পেগু ভ্রমণের বিবরণ স্থান পেয়েছে ইংরেজ পাদরি স্যামুয়েল পার্চাসের একটি গ্রন্থে। ১৬২৫ সালে, ‘পার্চাস হাকলুইটাস পোস্টহুমা’ বা ‘পার্চাসের তীর্থযাত্রা’ নামে এই গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়, ফ্রেডরিকের মতে তখন বিশ্বের সবচেয়ে উর্বর দ্বীপগুলোর একটি হলো ‘সন্দ্বীপ’। যেখানে ‘অস্বাভাবিক কম দামে’ নানা পণ্য বেচাকেনা হতো। অনেক সস্তায় তিনি দ্বীপটি থেকে কেনাকাটা করেছেন। গরুর মাংস, চালসহ নানা জিনিস তিনি কিনেছিলেন বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর এই বিবরণ ১৫৬৯ সালের।১৬২০ সালের দিকে সন্দ্বীপ থেকে বছরে প্রায় ২০০ জাহাজ লবণ বাইরে রপ্তানি হতো বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। স্কটিশ বণিক ও পরিব্রাজক ক্যাপ্টেন আলেকজান্ডার হ্যামিলটন ১৬৮৮ থেকে ১৭২৩ সালের মধ্যবর্তী দীর্ঘ ৩৫ বছর দক্ষিণ এশিয়া, দূরপ্রাচ্য এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সমুদ্রযাত্রা ও বাণিজ্য করে কাটান। তাঁর ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা হয়েছে ‘এ নিউ অ্যাকাউন্ট অব ইস্ট ইন্ডিজ’। ক্যাপ্টেন আলেকজান্ডার হ্যামিলটনের এই গ্রন্থটিতে উল্লেখ করা হয়, তখন সন্দ্বীপে মাত্র এক ‘রুপি’ দিয়ে ৫৮০ পাউন্ড চাল অথবা ৬০টি মুরগি পাওয়া যেত। দ্বীপটিতে কাপড়ের দামও ছিল ‘অবিশ্বাস্য রকমের কম’।

রবিন হুডের মতো দিলাল ধনীদের এবং বহিরাগতদের লুণ্ঠন করতেন, কিন্তু নিজের প্রজাদের ও দরিদ্র মানুষের রক্ষক ছিলেন বলে উল্লেখ করা হয় ইস্টার্ন বেঙ্গল অ্যান্ড আসাম ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার্সে। তবে দিলাল যে ‘মগ’-পর্তুগিজদের মতো দস্যুবৃত্তিতে ছিলেন না, তার ইঙ্গিত ইতিহাসে মেলে।
তবে সন্দ্বীপ তখন এর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল এর ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে। সেই সময়ে চট্টগ্রাম বন্দর ছিল ‘পূর্ব বাংলার’ প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র। ফলে সন্দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চট্টগ্রামের পুরো সামুদ্রিক বাণিজ্যকে অবরুদ্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব ছিল। একই কারণে সামরিক নিরাপত্তার দিলালের পরিচয় নিয়ে জনশ্রুতি
ঐতিহাসিকদের বেশির ভাগ দিলওয়ার খানকে মোগল সেনাবাহিনীর পলাতক অধিনায়ক উল্লেখ করলেও তাঁর জন্ম-বেড়ে ওঠা নিয়ে ভিন্ন মতও পাওয়া যায়। তাঁর বেড়ে ওঠা ও ক্ষমতায় আরোহণ নিয়ে রয়েছে নানা জনশ্রুতিও।

এসব জনশ্রুতিকে অনুসরণ করে দিলাল রাজাকে নিয়ে একটি লেখা লিখেছিলেন মৌলভি মো. আব্দুল হালিম। লেখাটি কলকাতার ইম্পিরিয়াল প্রেস থেকে ১৯০৭ সালে প্রকাশিত ‘জার্নাল অব দ্য মোসলেম ইনস্টিটিউট’–এ ছাপা হয়। মৌলভি আব্দুল হালিম লিখেছিলেন, ‘দিলাল রাজা ছিলেন এক মুসলিম বণিকের সন্তান। বঙ্গোপসাগরে ঝড়ে পণ্যবোঝাই নৌকা বিধ্বস্ত হয়ে তাঁর বাবা প্রাণ হারান। ঘটনার সময় তিনি তাঁর মায়ের গর্ভে ছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর দিলালের মা নিঃস্ব হয়ে পড়েন। যার কারণে ১০ বছর বয়সে একটি ব্রাহ্মণ পরিবারে রাখাল হিসেবে কাজ করতে দিলালকে পাঠান। দিলাল ছিলেন খুবই একগুঁয়ে স্বভাবের। একদিন মনিবের সঙ্গে ঝগড়া করে তিনি মাঠে গরু চরাতে চলে যান। ব্রাহ্মণ নিজে দুপুরের খাবার নিয়ে মাঠে গেলে দেখতে পান, একটি বিশাল গোখরা সাপের ফণার নিচে দিলাল ঘুমাচ্ছেন। পরে বাড়িতে ফিরে এটিকে রাজা হওয়ার লক্ষণ হিসেবে দিলালের কাছে বর্ণনা দেন ওই ব্রাহ্মণ। এই ভবিষ্যদ্বাণী দিলালের তেজস্বী স্বভাব ও উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে আরও উসকে দেয়। দিলাল ২০ বছর বয়সে কিছু দুঃসাহসী যুবককে নিয়ে দল গঠন করেন। সাগরের ঢেউয়ে ভেসে আসা জাহাজডুবির মালামাল সংগ্রহ করতেন তাঁরা। এ ছাড়া চরে আটকে পড়া নৌকায় লুণ্ঠনও করতেন। এরই ধারাবাহিকতায় একসময় দিলালের দল সন্দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেয়।

ব্রিটিশ আমলে (১৯১১) প্রকাশিত ‘ইস্টার্ন বেঙ্গল অ্যান্ড আসাম ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার্স: নোয়াখালী’তেও দিলালের মাথার ওপর গোখরা সাপের ফণা ধরার এই জনশ্রুতির উল্লেখ রয়েছে।

ক্ষেত্রেও সন্দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ ছিল ভাগ্যনির্ধারক। যার কারণে এটি দখলে রাখার জন্য তখন মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন মোগল শাসক, আরাকানরাজ, পর্তুগিজ জলদস্যু ও স্থানীয় স্বাধীন শাসকেরা।

বাংলাদেশ সময়: ১৩:৩১:৩৫ ● ৬ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ