
বাংলার স্বভাব কবি, চারণ কবি , মরমী তথা বাউল কবিদের কথা: পর্ব-২
স্বভাব কবি সম্পর্কে সূচনাতে উল্লেখ করেছি। বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে একটা উদাহরণ দিলে। তাই স্বভাব কবি সম্পর্কে একটু লিখা উচিৎ মনে করছি।
আমাদের দেশের কবি গোবিন্দ চন্দ্র দাসকে স্বভাব কবি বলা হয়ে থাকে। তিনি ১৮৫৫ সালের ১৬ জানুয়ারী ঢাকা জেলার ভাওয়াল জয়দেবপুরে জন্মগ্রহন করেন। পরিবারটি খুব একটা স্বচ্ছল ছিলনা। শৈশবে পিতা মারা যাবার পর তিনি উচ্চ শিক্ষা আর করতে পারেননি। ভাওয়ালরাজ প্রতিষ্ঠিত জয়দেবপুর মাইনর স্কুল থেকে ছাত্রবৃত্তি পাস করে তিনি ঢাকার নর্মাল স্কুলে ভর্তি হন। এবং নবম শ্রেণীতে পড়া কালীন তিনি ভাওয়ালের ব্রাহ্মণগ্রাম বঙ্গ বিদ্যালয়ে হেড পন্ডিত হিসেবে যোগদান করেন। পরে তিনি পর্যায়ক্রমে ১৮৭৭সালে ভাওয়াল এস্টেটের রাজকুমারের প্রাইভেট সেক্রেটারি হন , ১৮৮০ সালে হন সুসঙ্গ দুর্গাপুরের জমিদারের খাজাঞ্চি এবং মুক্তাগাছার জমিদার বাড়ির সেরেস্তাদার হন ১৮৮০-৮২ সালে। পরে ময়মনসিংহের এন্ট্রান্স স্কুলের পন্ডিত হন । ময়মনসিংহ সাহিত্য-সমিতির অধ্যক্ষ হন ১৮৮২-৮৪ সালে, আর শেরপুরের জমিদারের প্রতিষ্ঠিত সাপ্তাহিক চারুচর্চার কর্মাধ্যক্ষ হয়েছিলেন ১৮৮৪-৯৪ সাল পর্যন্ত। তিনি ১৮৮৭- ৮৮ সালে কলকাতায় অবস্থান কালে মাসিক পত্রিকা বিভা প্রকাশ করেন। রবীন্দ্রনাথের সমকালে আধুনিক গীতিকবিতার ধারায় কবিতা রচনা করেই গোবিন্দচন্দ্র দাস খ্যাতি লাভ করেন। রবীন্দ্র বলয়কে অবশ্য তখন উপেক্ষা করা খুব সহজ কাজ ছিল না। মধুসূদন,হেমচন্দ্র রঙ্গলাল রচিত মহাকাব্যের যুগে রবীন্দ্রনাথের পূর্ব পর্যন্ত প্রধানত বিহারীলাল চক্রবর্তী গোবিন্দচন্দ্র দাস, কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার প্রমুখ কবি বাংলা গীতিধারার কবিতা বজায় রেখেছিলেন। নরনারীর ইন্দ্রিয়জ প্রেম গোবিন্দচন্দ্রের কাব্যের মুখ্য বিষয়বস্তু ,তবে স্বদেশপ্রেম, পল্লিপ্রকৃতি ও মানবজীবনের কথাও কাব্যে উপেক্ষিত হয়নি। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ সমূহ হচ্ছে প্রসূন ( ১৮৭০ ) প্রেম ও ফুল ( ১৮৮৮) ,কুঙকুম ( ১৮৯২ ) ,মগের মুলুক ( ব্যঙ্গ কাব্য- ১৮৯৩ ) , কস্তুরী ( ১৮৯৫ ) , চন্দন ( ১৮৯৬ ), ফুলরেণু ( সনেট-১৮৯৬ ) বৈজয়ন্তী ( ১৯০৫ ), শোক ও সান্ত্বনা ( ১৯০৯ ) ,শোকোচ্ছ্বাস ( ১৯১০ ) ইত্যাদি। এ ছিাড়াও তিনি আ্যালেন হিউমের অ্যয়োত্রক কবিতা এবং ভগদ্বগীতার কাব্যানুবাদ করেন।
তাঁর কবিতার বৈশিষ্ট্য ,তিনি উচ্চতর ইংরেজী বা সংস্কৃত শিক্ষার সুযোগ পাননি। তাই তাঁর কবিতা কিঞ্চিৎ অমার্জিত হলেও তীব্র আবেগ ও গভীর পত্নিপ্রেম ফুটে উঠেছে। তাঁর প্রথমা পত্নী সারদাসুন্দরীর মৃত্যুর প্রায় সাত বছর পর ১৮৯২ সালে তিনি দ্বিতীয়বার দ্বার পরিগ্রহ করেন। কিন্তু কবিতার মাধ্যমে তিনি তাঁর প্রথমা পত্নীকে অমর করে গেছেন। গোবিন্দচন্দ্র তাঁর কবিতায় যে আঞ্চলিক রীতি প্রয়োগ করে গেছেন তার ফল বাংলা কবিতায় এক নতুন স্বাদের সৃষ্টি হয়েছে। ১৯১৮ সালের ১ অক্টোবর তাঁর জীবনাবসান ঘটে।
গোবিন্দ চন্দ্র দাস দুঃখ কষ্টে মাতৃভুমি জয়দেবপুর ত্যাগ করেন। ভাওয়ালকে নিয়ে তিনি একটি কবিতাও লিখেছেন। - ভাওয়াল আমার অস্তি মজ্জা ভাওয়াল আমার প্রাণ, আমি তার নির্বাসিত অধম সন্তান। তার সে মধুর প্রীতি, মনে জাগে নিতি নিতি।
তাঁর প্রতিবাদী চেতনার বৈশিষ্টের কারনে অনেক সময় তিনি বিপদের সম্মুখীণও হয়েছেন। তিনি যখন ভাওয়াল স্টেটে চাকরি করতেন,তখন রাজাদের অত্যাচার ও দেওয়ান কালীপ্রসন্ন ঘোষের অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ করায় সেখান থেকে তিনি বিতাড়িত হন। পরবর্তী কালে তিনি যখন কলকাতায় অবস্থান করছিলেন তখন নব্যভারতের সম্পাদক দেবীপ্রসন্ন রায়চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা হয় এবং তাঁর আশ্রয়ে থেকেই তিনি মগের মুলুক নামক সুপ্রসিদ্ধ কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন। অপরিসীম দারিদ্রের মধ্যে গোবিন্দচন্দ্রের সমগ্র জীবন অতিবাহিত হয়, যার ছায়াপাত ঘটেছে তাঁর কবিতায়। সূত্র- ইন্টারনেট। ( চলবে )