রঙলেপা- ( রঙে ভরা লেখক-পাঠক ফোরাম ) ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরেঃ পর্ব-৪৫ স্বপন চক্রবর্তী

Home Page » সাহিত্য » রঙলেপা- ( রঙে ভরা লেখক-পাঠক ফোরাম ) ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরেঃ পর্ব-৪৫ স্বপন চক্রবর্তী
সোমবার ● ২৬ অক্টোবর ২০২৬


স্বপন চক্রবর্তী

সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে-২
লীলাময়ের লীলা কে বুঝতে পারে। তাঁর মহিমায় পতিতোদ্ধারিনীর স্নিগ্ধ লহরে অন্তেষ্টিকৃত লালনের অন্তঃসংঙ্গাশীল দেহ তীরে উঠে এলো। তাঁর কন্ঠ থেকে অস্ফুটস্বর উত্থিত হলো। এমন সময়ে সেখানে দয়াবতী মুসলমান এক রমণী জল সংগ্রহ করতে এসেছিলেন। তিনিই তাঁর কন্ঠ নিঃসৃত কাতর শব্দটি শুনলেন এবং নিকটে গিয়ে গঙ্গা নিক্ষিপ্ত শবটিকে দেখে নিশ্চিত হলেন যে, লোকটি তখনও বেঁচে আছে। স্নেহ প্রবণ রমনী-হৃদয়টি কোন পরিনতির কথা না ভেবেই শুধুমাত্র সেবার মানসে তার স্নেহধার উথলিত হয়েছিল। মৃতপ্রায় দেহটিকে টেনে তুলে কিনারে রাখলেন। অতঃপর দ্রুত নিজগৃহে গিয়ে নিজের পরিবারের নিকট সবিস্তারে আশ্চর্য ধরনের মৃতপ্রায় লোকটির বিবরণ জানালেন। কৌতুহলাবিষ্ট লোকজন দ্রুত নদী তীরে আসেন এবং পরম স্নেহে ও দয়ার্দ্র হৃদয়ে হতভাগ্য এ জীবন্মৃত মানুষটিকে বাড়ি নিয়ে গেলেন। মুসলিম এই অসামান্যা রমণী ছিলেন মাতৃরূপিনী মূর্তীমতি করুণার সাগর একজন তন্তুবায় জাতীয়।
ভীষণ পীড়ায় জীবনে হতাশ, সহযাত্রী তীর্থবন্ধু কর্তৃক অপরিচিত, জনশূন্য এক সৈকতে পরিত্যক্ত লালন হয়তো প্রাণ খুলে অকুলের কান্ডারীর সর্বময়ের লীলা ও করুনার রূপ প্রত্যক্ষ করতে সকরুণ চিত্তে ডাকতে লাগলেন। তখনই সেই অসহায় নিরাশ্রয়ের আশ্রয় যেন নারীরূপ ধারণ করে বিজন বেলায় লালনকে আপন অভয় অঙ্কে স্থান দিতে ছুটে আসলেন।
বসন্ত একটি অতি উচ্চ সংক্রামক রোগ। তথাপী সব কিছুকে ছাপিয়ে মাতৃস্নেহের ঝর্ণাধারাই যেন নেমে এলো অসহায় এক লালনের উপর।
তাঁত ঘরের এক কোনে রেখে আপন সন্তানবৎ যত্ন-সেবা শুশ্রুষা করতে লাগলেন সেই রমণী। অন্য সকলেই লালনের জীবনরক্ষার বিষয়ে হতাশ হলেন। কিন্তু নৈরাশ্যবাদীদের অবাক করেই দিনের পর দিন অতীত হতে লাগলো ।
রোগীর অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলো। তখন সকলেই পরম আগ্রহে তাঁর খুঁজ রাখতে লাগলেন। মাতৃরূপিনী নারীর ক্লান্তিহীন ও নিদ্রাহীন সময় উৎকন্ঠায় অতিক্রান্ত হতে লাগলো। জননীরূপী নারীর সাথে যমের যেন টানাটানি চলছে। অবশেষে জননীই জয়ী হলেন। লালন আরোগ্য লাভ করলেন। তাঁর আশ্রয়দাত্রীর প্রাণের প্রচ্ছন্ন মমতায় সজীব মূর্তী মেঘমুক্ত সূর্যের ন্যায় লোকচক্ষুর সম্মুখে উদ্ভাসিত হলো। তখন লালন জীবনদাত্রী জননীর নিকট নিজের পরিচয় ও তীর্থ ভ্রমণের আনুপূর্বক ঘটনা সবিস্তারে জানালেন। অতঃপর বিদায় নিয়ে লালন পদব্রজে নিজ গৃহের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন।
এদিকে যে সকল গুণধর সহযাত্রী কথিত লালনের মুখাগ্নিক্রিয়া সম্পন্ন করে গঙ্গাপ্রাপ্তির সৌভাগ্যের কথা তাঁর জননী এবং প্রিয়তমা স্ত্রীর নিকট সুললিত ভাষায় সগৌরবে বর্ণনা করেছিলেন এবং মহৎ কর্ম সম্পাদন করতে পারার একটা আত্মতৃপ্তি লাভ করে ছিলেন, অন্যান্য সহযাত্রী সহযোগে তীর্থ শেষে লালন ঘরে ফিরছে ভেবে লালনের স্ত্রীও জননী বহু আশায় যখন দিনের পর দিন পথ চেয়ে বসে ছিলেন, তখন হায়! অদৃষ্টের নিদারুন পরিহাস এই লালনের গঙ্গাপ্রাপ্তির সংবাদ এসে পৌঁছালো।
নির্দিষ্ট দিনে লালনের শ্রাদ্ধাদি পারলৌকিক ক্রিয়া যথাবিধি সম্পন্ন করে তাঁর স্ত্রী বৈধব্যাচার পালন করতে শুরু করলেন।
মাতা পদ্মাবতীর আর তেমন কেহই অন্তরঙ্গ নেই, একমাত্র বিধবা পুত্রবধূ ,অতি কষ্টের দিন দিনাতিপাত চলছে। ( চলবে )

বাংলাদেশ সময়: ২০:০৫:৩৬ ● ৪৯ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ