রঙে ভরা আমার ব্যাংকিং জীবন–লোন মিললেও ছুটি মিলল না-১ : জালাল উদ্দীন মাহমুদ

Home Page » সাহিত্য » রঙে ভরা আমার ব্যাংকিং জীবন–লোন মিললেও ছুটি মিলল না-১ : জালাল উদ্দীন মাহমুদ
বুধবার ● ৩১ মে ২০২৩


জালাল উদ্দীন মামুদ
সে সময় আমাদের ব্যাংকে কর্মচারী গৃহনির্মাণ ঋনের জন্য প্রথমে সামান্য পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেয়া হতো।পরে কিস্তিতে কিস্তিতে বছর বছর কিছু কিছু করে অর্থ বরাদ্দ দেয়া হতো। এতে চাহিদা তো মিটতোই না বরং একটু একটু করে কাজ করাতে জটিলতা বাড়ত। ব্যয় বাড়ত । ব্যাংকাররা না পারত ঠিকমতো সে বাসায় থাকতে, না পারত সে বাসা ভাড়া দিতে। সব কিছুই হাফ ডান হাফ ডান অবস্থা। এই সামান্য সামান্য পরিমাণ ঋণ নিতেও আবার তদবির লাগতো। সংগঠনের নেতাদেরও ধরতে হতো। একটা অস্বস্থিকর অবস্থা। ব্যাংকে যোগদানের পর ডেমাজানী শাখাতে থাকতে আমি ২৫,০০০/= টাকা মটর সাইকেল লোন নিয়ে এবং তার সাথে ইমম্যাচিউরড ডিপোজিট পেনশন স্কীম ভাঙ্গিয়ে প্রতি শতাংশ ৯,০০০/= টাকা করে স্ত্রীর অফিস বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছাকাছি জায়গা কিনেছিলাম। সেখানে বাড়ি করার সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু আমার ব্যাংকে ঋণ প্রাপ্তির চেষ্টা করে ব্যর্থ হলাম। বরাদ্দ কম। এখনকার মত তখনকার ম্যানেজমেন্ট এ ব্যাপারে কেন যে এত অনুদার ছিল বুঝি না। আদায়ের দুশ্চিন্তা নাই, কর্মচারীরা অনুপ্রাণিত হবে- তারপরেও এখানে তখন ভীষণ কৃপণতা করা হতো। চাহিদা বেশি যোগান কম, পুরানো কালের সিনেমা হলের টিকিট যেমন বেশি দামে ব্লাক মার্কেট থেকে কিনতে হতো এখানেও সেই অবস্থা।ধারাধরি,তদবির সবই চলত সে সময়। কিন্তু আদায়ের শতভাগ সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাজেট বাড়ানো হতো না কিছুতেই।
বিষয়টি আমি আমার স্ত্রীর সাথে শেয়ার করলাম। সে বলল ঋণ পাবার যোগ্য হলে বাংলাদেশ ব্যাংকে ডেকে ডেকে কর্মকর্তা/কর্মচারীদের গৃহ নির্মাণ ঋণ দেয়া হয়। আমি রাজী থাকলে সে ঋণ নিবে। স্ত্রীর টাকায় বাড়ি করব কিনা -সিদ্ধান্ত নিতে পারলাম না। আমি আমার ব্যাংকে চেষ্টা করতেই থাকলাম। কিন্তু গোল পোস্টে হিট করতে পারলাম না। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে স্ত্রীর নামেই গৃহ নির্মাণ ঋণ নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। অচিরেই ২৫.০০ লক্ষ টাকার মঞ্জুরী পেলাম। কোনও প্রকার তদবির লাগল না।
ঋনের প্রথম কিস্তি ছাড় করার পর আমার হাতে অনেক টাকা এসে গেল। হঠাৎ আমি চেঞ্জ হয়ে গেলাম। এতগুলো নগদ টাকা হাতে! ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ, যাবৎ জীবেৎ সুখং জীবেৎ।’ অর্থাৎ ঋণ করে হলেও ঘি খাও, যতদিন বাঁচো সুখে বাঁচো- এ দর্শন মনে কি বাসা বেঁধেছিল? জানিনা। কোনও দিন আমি অমিতব্যয়ী ছিলাম না বরং হিসেবিগোছের ছিলাম । কিন্তু বিপুল নগদ টাকা হাতে পাবার পর মনে হলো –আমার এখন অনেক কিছু প্রয়োজন । গান শোনার টু ইন ওয়ানটা বদলালাম। নতুন হাতঘড়ি কিনলাম। সুন্দর দেখে দেওয়াল ঘড়ি কিনলাম। বেশি বেশি বাজার করা শুরু করলাম। শাকের খাও ছা মাছের খাও মা। তাই বড় বড় মাছ কেনা শুরু করলাম। খোলা তেলের পরিবর্তে টিন ভর্তি সয়াবিন তেল কেনা শুরু করলাম।ছোট বাচ্চার জন্য খেলনা কিনে কিনে খেলনার স্তুপ বানিয়ে ফেললাম। আরো কত কী । আমার স্ত্রী খরচের এসব বাড়াবাড়ি দেখেও না দেখার ভান করে থাকল।
আমার হাতে ঋণ বেশি নগদ অর্থ আসায় মিতব্যয়ী থেকে আমি সাময়িকভাবে অমিতব্যয়ীতে রূপান্তরিত হয়েছিলাম । সেক্ষেত্রে কৃষক বা দরিদ্র জনগোষ্টি ব্যাংক বা এনজিও থেকে হঠাৎ করে বেশি নগদ টাকা পেলে কিছু যে অপচয় করবে, তা আর বিচিত্র কী?
(চলবে )

( লেকক ,কবি ও সাবেক ব্যাংকার তিনি। তার লেখা কয়েকটি বই ছাপা হয়েছে। পাঠক নন্দিতও হয়েছে।)

বাংলাদেশ সময়: ২০:০৬:৩৪ ● ৩২৬ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ