
জ্ঞান পিপাসু ও বই প্রেমী মানুষের গল্প-২
( পূর্বে প্রকাশিতের পর )
আরজ আলী মাতুব্বরের জ্ঞানের পরিধি মাপতে আর একটি ঘটনার উল্লেখ করা যায়। লেখাটির আকার বড় হয়ে যাচ্ছে যদিও তথাপী উল্লেখ করছি।
অধ্যাপক সাহেব বরিশাল থেকে বিদায় নিয়ে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করবেন। তখন তিনি রামকৃষ্ণ মিশনে একটি বকৃতার জন্য আমন্ত্রিত হন । এই বিব্রতকর অবস্থার বর্ণনা টুকু তার লেখাতেই তুলে ধরছি। ” আমাদের বরিশাল ছাড়ার মাস চারেক আগে রামকৃষ্ণ মিশনের সচিব, আমার প্রিয় ছাত্র মাণিকলাল চ্যাটার্জী গোটা বিশেক বইসহ একখানা আমন্ত্রণলিপি আমার নামে বাসায় রেখে যান। স্বামী বিবেকানন্দের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আমাকে প্রধান বক্তা করা হয়েছে। সম্ভবত প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা রামকৃষ্ণ মিশনের প্রবীণ এবং অবসরপ্রাপ্ত স্বামী অক্ষরানন্দ। বিশেষ অতিথি কলকাতার বেলুড় মঠের তরুণ স্বামী প্রেমানন্দ। আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। উপনিষদ, বেদান্ত বা চার্বাক দর্শনের কিছুই জানিনা। ভরসা মাণিকলালের দেয়া বই আর কাজী গোলাম কাদির সাহেব। স্যারের কাছে সব খোলাসা করে বলাতে তিনি বললেন, এ আর এমন কি ? একমাস সময় হাতে আছে। বই পড়ুন আর সন্ধ্যার সময় হোস্টেল সুপারের অফিসে আসুন। কাজের ফাঁকে ফাঁকে বুঝিয়ে দেবোখন।
কাজী সাহেব আমাকে সংস্কৃত শ্লোক উদ্ধৃত করে বোঝাতে লাগলেন। স্যার যত বোঝান, আমি তত অবুঝ হয়ে পড়ি। কতগুলো ভারী ভারী দার্শনিক শব্দ এবং উপমা আমার মস্তিষ্কের ভেতর কৈ মাছের মতো অবাধে বিচরণ করতে লাগল। তিনি মাঝে মাঝে পরীক্ষা নিলে আমি অবধারিতভাবে ফেল মারতে শুরু করলাম। পরে লজ্জা-শরমের তাড়নায় স্যারের স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিলাম। এর মধ্যে একদিন দুপুরে মাতুব্বর সাহেব ( জনাব আরজ আলী ) এসে হাজির। খাওয়া-দাওয়ার পর নানা কথার ঝুলি খুলে দিলাম। কথায় কথায় আমার দার্শনিক সংকটের কথা বললাম। তিনি অত্যন্ত সহজ-সরল ভাষায় দ্বৈতাদ্বৈত দর্শন, কালী দর্শন, উপনিষদ কি, বেদান্ত দর্শনের সঙ্গে বিবেকানন্দের জীবন দর্শনের সম্পর্ক কি, তিনি পরমপুরুষ রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের শিষ্যত্ব কেন গ্রহন করলেন ইত্যাদি বোঝাতে লাগলেন। শঙ্কর রামানুজের বেদান্ত দর্শনের ব্যাখ্যার সঙ্গে বিবেকানন্দের ব্যাখ্যার পার্থক্য কোথায়- এটাও সংক্ষেপে সহজ ভাষায় বুঝিয়ে দিলেন। আমি তাঁর কথা শুনতে শুনতে কাগজে নোট নিতে লাগলাম।
সেই সময়ের জন্য আমি আমার প্রয়োজনমাফিক উপাদান পেয়ে গেলাম। কাজী সাহেব মাঝে মাঝে প্রশ্ন করলে আমি গুডবয়ের মতো উত্তর দিতে লাগলাম। কাজী সাহেব খুশী হয়ে বলতেন, বাহ্ এই তো পরিষ্কার বুঝতে পারছেন। আসল গোমর কি ফাঁক করা যায় ? বক্তৃতা দেয়ার সেই শুভক্ষণটি এলো। মঞ্চের মাঝখানে বসলাম। ডানদিকে বৃদ্ধ স্বামী, বামদিকে তরুণ স্বামী। আমার পোশাক এবং চেহারার জন্য স্বামীদ্বয় বিরসবদন। তাঁদের গেরুয়া বসন। মাঝখানে আমার অবস্থা যৌতুকবিহীন পাত্রীর মতো। একজন স্বামী পরলোকগত। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে এসে জীবিত স্বামীদ্বয় নিয়ে মনে হলো সংকটে পড়লাম।
সে যাহোক. অবশেষে সভাপতি শ্রদ্ধাভাজন জয়ন্ত দাশগুপ্ত আমাকে বক্তৃতা দেয়ার জন্য মাইকের সামনে আহ্বান করলেন। সভাপতিকে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্বোধন করে বললাম, আমার প্রিয় সন্ন্যাসী বিবেকানন্দকে আজকে মঠে বন্দী করা হয়েছে- তিনি তো মঠের সন্ন্যাসী নন, তিনি মাঠের সন্ন্যাসী। বলেই তাঁর জীবনদর্শন, বিশ্বমানবতার প্রতি আহ্বান, শিকাগোর বক্তৃতার উদ্ধৃতি ইত্যাদি বর্ণনা করে প্রায় একঘন্টা বক্তৃতা করলাম। স্বামী দু’জন আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। একজন বেলুড় মঠে আমন্ত্রণ জানালেন। আমার যৌতুক দেয়া হয়ে গেলো বুঝি।
বাসায় সারারাত ঘুমের মধ্যেও চোখে ভেসে উঠল আরজ আলী মাতুব্বরের চেহারা। কাজী সাহেব অত্যন্ত উচ্চমার্গ থেকে বলতেন বলে মানসিক প্রস্তুতি না থাকার কারণে তাঁকে বুঝে উঠতাম না। আর মাতুব্বর সাহেব কঠিন বিষয়কে সহজ করে বলার অসাধারণ ক্ষমতা অর্জন করেছিলেন। তাঁর বলার ভঙ্গি . চলার ভঙ্গি এবং লেখার ভঙ্গি তাঁর জীবনাচরণের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ” ।
বন্ধুবৎসল আরজ আলীর সাথে আড্ডা দিতেন যারা, তাঁরাও সকলে ছিলেন খ্যাতিমান। অধ্যক্ষ সাঈদুর রহমান, এমিরেটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইললাম চৌধুরী, লেখক ও প্রখ্যাত যৌনবিজ্ঞানী আবুল হাসনাত, হাসনাত আব্দুল হাই, শিল্পী আবুল কাশেম ও তৎকালীন পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান বারী মালিক সবার সঙ্গে তার বন্ধুত্ব হয়েছিল, হতো নিয়মিত আড্ডা। অবশেষে সকলের আমন্ত্রণে তাকে ঢাকাস্থ “ মিলন সংঘে”র সদস্যপদ গ্রহণ করতে হয়েছিল। যতদিন শারীরিক সামর্থ ছিল , আরজ আলী বহু কষ্টে বাসের হাতলে ঝুলে তাদেরকে সঙ্গ দিতে ঢাকায় আসতেন। ঠিক একইভাবে বাসের হাতলে ঝুলে অধ্যাপক মুহম্মদ শামসুল হক সাহেবের সাভারস্থ বাসায় আমন্ত্রিত হয়ে আসতেন। ( চলবে )