
অবশেষে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের (বিএসসি) জাহাজ এমভি বাংলার জয়যাত্রা। যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সামরিক উত্তেজনা ও নিরাপত্তা অনিশ্চয়তার কারণে দীর্ঘ সময় পারস্য উপসাগর এলাকায় আটকে থাকার পর মঙ্গলবার ভোরে কৌশলগত এই নৌপথ পার হতে সক্ষম হয় জাহাজটি।
বিএসসি সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার ভোররাত ৩টার দিকে জাহাজটি হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে। বর্তমানে এটি জ্বালানি সংগ্রহ (বাংকারিং) ও প্রয়োজনীয় আনুষঙ্গিক কার্যক্রমের জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক। তিনি জানান, ৩১ জন বাংলাদেশি নাবিক ও ক্রুকে নিয়ে জাহাজটি নিরাপদে হরমুজ প্রণালি পার হয়েছে। জাহাজের অতিরিক্ত চিফ অফিসার প্রণয় সাহাও বার্তায় একই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
বিএসসির তথ্য অনুযায়ী, গত ২ ফেব্রুয়ারি জাহাজটি হরমুজ হয়ে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করে। পরে কাতারের একটি বন্দর থেকে স্টিল কয়েল বোঝাই করে ২৭ ফেব্রুয়ারি সংযুক্ত আরব আমিরাতের জাবেল আলী বন্দরে পৌঁছায়। কিন্তু এর পরপরই মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা তীব্র হয়ে উঠলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। এতে জাহাজটির পরবর্তী যাত্রা অনিশ্চয়তায় পড়ে।
১১ মার্চ জাবেল আলীতে পণ্য খালাস শেষে জাহাজটির কুয়েতে যাওয়ার কথা থাকলেও নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে বিএসসি সেটিকে সংঘাতপূর্ণ এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে সৌদি আরবের রাস আল খায়ের বন্দর থেকে প্রায় ৩৭ হাজার টন সার বোঝাই করে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনের উদ্দেশে যাত্রার প্রস্তুতি নেয় জাহাজটি। তবে হরমুজ প্রণালিতে চলাচল স্বাভাবিক না থাকায় সেটি আবারও আটকে পড়ে।
পরবর্তীতে যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর গত ৮ এপ্রিল রাস আল খায়ের বন্দর ত্যাগ করে ‘বাংলার জয়যাত্রা’। কিন্তু ১০ এপ্রিল হরমুজ অতিক্রমের চেষ্টাকালে ইরানি কর্তৃপক্ষের বাধার মুখে পড়ে জাহাজটি। এরপর এটি ওমান উপসাগরসংলগ্ন নিরাপদ এলাকায় অপেক্ষা করতে থাকে। শেষ পর্যন্ত সাম্প্রতিক কূটনৈতিক অগ্রগতি ও আঞ্চলিক উত্তেজনা কিছুটা কমে আসার প্রেক্ষাপটে জাহাজটি হরমুজ প্রণালি পার হতে সক্ষম হয়েছে বলে জানিয়েছে বিএসসি।
সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০১৮ সালে নির্মিত ৩৮ হাজার ৮৯৪ ডেডওয়েট টন (ডিডব্লিউটি) ধারণক্ষমতার বাল্ক ক্যারিয়ার ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’ এখন ফুজাইরা বন্দরের জলসীমার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সেখানে বাংকারিং ও প্রয়োজনীয় ক্লিয়ারেন্স শেষে জাহাজটির পরবর্তী গন্তব্যের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বিএসসি আরও জানিয়েছে, জাহাজে থাকা ৩১ জন নাবিক ও ক্রু সবাই সুস্থ ও নিরাপদ আছেন। দীর্ঘ অনিশ্চয়তার পর জাহাজটির হরমুজ অতিক্রম করাকে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটির জন্য বড় স্বস্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্ব জ্বালানি ও বাণিজ্য পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি গত কয়েক মাস ধরেই আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে ঝুঁকির মুখে ছিল। এর প্রভাব পড়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলেও। এমন পরিস্থিতিতে ‘বাংলার জয়যাত্রা’র নিরাপদে হরমুজ পার হওয়া শুধু বিএসসির জন্যই নয়, বাংলাদেশের সামুদ্রিক পরিবহন খাতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ এক অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।