বঙ্গনিউজ: প্রায় এক যুগ পর সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে আগামী ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নবম জাতীয় পে স্কেল কার্যকরের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
এ লক্ষ্যে বাজেটে ৪৪ হাজার কোটি টাকা সংরক্ষণ করায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে। তবে ঘোষণার পরই প্রশ্ন উঠেছে—নতুন পে-স্কেলের সুবিধা কারা পাবেন এবং কারা এখনো অপেক্ষায় থাকবেন?
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নবম পে স্কেলের প্রধান সুবিধাভোগী হবেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তবে পেনশনভোগী, এলপিআরে (অবসরোত্তর ছুটি) থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী এবং স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের ক্ষেত্রে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি।
অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় আগামী ১ জুলাই থেকে নবম পে স্কেল কার্যকরের ঘোষণা দিলেও বাস্তবায়ন হবে ধাপে ধাপে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রথম ধাপে সংশোধিত বেসিক বেতনের একটি অংশ কার্যকর করা হতে পারে। পরবর্তী ধাপগুলোতে বাকি বেতন ও ভাতা সমন্বয় করা হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জুলাই থেকে কার্যকর হলেও বর্ধিত বেতনের অর্থ হাতে পেতে অক্টোবর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।
নবম পে স্কেল বাস্তবায়নে সরকার কয়েকটি বিকল্প বিবেচনা করছে। এর মধ্যে রয়েছে— প্রথম ধাপে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি। ১ম থেকে ৯ম গ্রেডে ৪০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডে ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি। নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে বেসিক বেতন শতভাগ বৃদ্ধির প্রস্তাব। তবে কোন মডেল চূড়ান্ত হবে, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।
নবম পে কমিশন সর্বনিম্ন বেতন বর্তমান ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করেছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন গ্রেডে ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে। ফলে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়িত হলে সরকারি চাকরিজীবীদের প্রকৃত আয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে।
গত বুধবার সচিব কমিটির বৈঠকে পে কমিশনের জনপ্রশাসন-সংক্রান্ত সুপারিশগুলো নিয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে বিচার বিভাগ ও সশস্ত্র বাহিনীর জন্য প্রস্তাবিত কাঠামো নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
সূত্র জানিয়েছে, এ দুটি খাতের বিষয়ে আরও আলোচনা হবে এবং প্রয়োজন হলে নতুন বৈঠক ডাকা হবে।
সভা-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে এলপিআরে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও নবম পে স্কেলের আওতায় আনার বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হয়েছে। ফলে অবসরের প্রাক্কালে থাকা কর্মচারীরাও নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধা পেতে পারেন।
বাজেটে সংরক্ষিত ৪৪ হাজার কোটি টাকার একটি অংশ পেনশনভোগী এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের সমন্বয়ের জন্য ব্যবহার হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে তাদের বেতন-ভাতা বা পেনশন কীভাবে পুনর্নির্ধারণ করা হবে এবং সরকারি কর্মচারীদের সঙ্গে একই সময়ে সুবিধা পাবেন কি না—সেসব বিষয়ে এখনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তায় রয়েছেন স্বায়ত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
বিভিন্ন করপোরেশন, কর্তৃপক্ষ, বোর্ড, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশেষায়িত সংস্থার অনেক কর্মী সরাসরি সরকারি বেতন কাঠামোর আওতায় না থাকায় তাদের ক্ষেত্রে পৃথক বোর্ড বা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রয়োজন হতে পারে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা এখনো চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপনের অপেক্ষায় রয়েছেন।
বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী সংযুক্ত পরিষদের সভাপতি মো. বাদিউল কবীর বলেন, নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের দাবিতে দীর্ঘদিন আন্দোলন করা হয়েছে। সরকার বাস্তবায়নের ঘোষণা দিলেও চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন জারি এবং বর্ধিত বেতন হাতে না পাওয়া পর্যন্ত পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, গত ১১ বছর ধরে নানা কারণে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নতুন পে স্কেল থেকে বঞ্চিত ছিলেন। এবার আমরা আশাবাদী, তবে বাস্তবায়নই হবে সবচেয়ে বড় বিষয়।
সব মিলিয়ে নবম পে স্কেলের মূল সুবিধাভোগী হতে যাচ্ছেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। পেনশনভোগী, এলপিআরে থাকা কর্মচারী এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক সম্ভাবনা রয়েছে। তবে স্বায়ত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের জন্য এখনো অপেক্ষা অব্যাহত রয়েছে।
চূড়ান্ত গেজেট, বাস্তবায়ন নির্দেশিকা এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রকাশের পরই স্পষ্ট হবে—নতুন পে স্কেলের আওতায় কে কতটা সুবিধা পাচ্ছেন এবং কার জন্য অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হচ্ছে।