রঙলেপা- ( রঙে ভরা লেখক-পাঠক ফোরাম ) ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরেঃ পর্ব-৪৬ স্বপন চক্রবর্তী

Home Page » সাহিত্য » রঙলেপা- ( রঙে ভরা লেখক-পাঠক ফোরাম ) ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরেঃ পর্ব-৪৬ স্বপন চক্রবর্তী
মঙ্গলবার ● ২৭ অক্টোবর ২০২৬


স্বপন চক্রবর্তী

সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে-৩

এমন সময়ে হঠাৎ একদিন অপরাহ্নে অপরিচিত কোনো যুবক পদ্মাবতীর দ্বারে এসে পরিচিত কন্ঠে “ মা “ বলে ডেকে উঠলেন। মাতা পদ্মাবতী শিহরে উঠলেন। সমস্ত গা কাঁটা দিয়ে একটি ঝাঁকুনি দিয়ে গেলো। তাঁর প্রাণ সমুদ্র যেন অনন্ত লহরীতে গর্জে উঠলো। সমুদ্রের সশব্দ গর্জন যেন সমতটেও আছড়ে পড়লো। মমতাময়ী এক মার প্রাণ মুহূর্তে আপন সন্তানকে চিনতে বিলম্ব হলো না।
পুত্র কালব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছে। জ্ঞাতিগন তাঁর মুখাগ্নিক্রিয়া পর্যন্ত সম্পন্ন করেছেন। তাঁর শ্রাদ্ধাদি সম্পন্ন হয়ে গিয়েছে। স্ত্রী কঠোর বৈধব্যাচার পালন করেতেছেন। সেই স্বর্গবাসী লালন স্বদেহে আজ দ্বারে উপণীত! যদিও বসন্তের কঠিন কষাঘাতে মুখশ্রী কিঞ্চিৎ বিকৃত , অন্যদিকে আবার মুখাগ্নির সলতের ক্ষতচিহ্ন ওষ্ঠপ্রান্তে জাজ্বল্যমান পরিস্ফুট, একদিকে তীর্থ-প্রত্যাগত জ্ঞাতিগনের প্রদত্ত বিবরণ- অন্যদিকে পুনরাগত পুত্রের মুখশ্রী- সকল কিছু একত্র সমাবেশ ঘটালে এই প্রহেলিকা মুক্ত যুবককে প্রকৃত লালন বলে সন্দেহ করতে কেহ ‍ধৃষ্টতা দেখাবে না। লালনের প্রিয়তমা স্ত্রী ও স্নেহময়ী মাতা পদ্মাবতী উভয়েই তাদের সম্বলকে চিনতে পারলেন।
পদ্মাবতী আপন বুকের সমস্ত সংশয় স্বীয় অন্তরে লুকিয়ে রেখে পরলোকপ্রত্যাগত পুত্রকে বসতে ‍দিলেন। লালনের মুখে আনুপূর্বিক শ্রবণ করলেন। তার প্রাণে উল্লাস লহরী উথলে উঠলো। কিন্তু হায় ! এক নিমিষে সব আশার আলো ঘোর অমানিশার অন্ধকারে যেন আচ্ছাদিত হলো। পদ্মাবতী শুনলেন,তার পুত্র মুসলমানের অন্ন গ্রহন করেছে। পদ্মাবতীর প্রাণের উচ্ছাস, হর্ষ সুধাকর বিষাদে-বারিতে আচ্ছাদিত হলো।
রাতে পদ্মাবতী প্রাণাধিক পুত্রকে থালার পরিবর্তে কদলীপত্রে এবং রন্ধনশালার পরিবর্তে শয়ন-গৃহের বারান্দায় স্থান করে দিলেন। লালন এইরূপ পরিবর্তনের কারণ জানতে জননীকে জিজ্ঞেস করলেন। কিন্তু স্নেহময়ী জননী নিরোত্তর থাকলেন।
পরদিন সকালে পদ্মাবতীর গৃহ লোকে লোকারণ্য হলো। রাতের মধ্যেই সর্বত্র প্রচারিত হয়ে গিয়েছে , লালন কর যমপুরী হতে লোকালয়ে প্রত্যাবর্তন করেছে। বসন্তের নির্মম কষাঘাতে লালনের মুখশ্রী সামান্য পরিবর্তিত হয়েছে বটে, তথাপী এসে সকলেই স্পষ্টভাবে সনাক্ত করতে সক্ষম হলো যে, তিনিই লালন কর, তাতে কোন সন্দেহ নেই। তা হোক, মহাপাপ যে করে ফেলেছে ইতিমধ্যেই। তার তো কোন সূরাহা নেই সমাজপতিদের নিকট। অন্নপাপ!! কোন অবস্থাতেই তা মেনে নেয়া যায় না। মুসলমান রমনীর হাতের অন্ন গ্রহণ করেছে। শরৎচন্দ্রের বিলাসী গল্পের ভাষায় বলা যায়, “ লুচি নয়, সন্দেশ নয়, পাঁঠার মাংস নয়, এ যে অন্নপাপ “। লালনের মুখেও রাখঢাকটি পর্যন্ত নেই। কৃতজ্ঞচিত্তে সে নিজেই বর্ণনা করছে। তাছাড়া তাঁর মুখাগ্নি-ক্রিয়া শেষে তাঁকে গঙ্গাবক্ষে নিক্ষেপ করা হয়েছে। তাঁর পারলৌকিক ক্রিয়াদিও যথারীতি সম্পন্ন হয়ে গিয়েছে। ইতিমধ্যে লালনের গ্রামের আবালবৃদ্ধ বণিতার নাম ধরে ধরে চিনেছে লালন, তখন তাঁকে প্রকৃত লালন কর বলে কেহ অস্বীকার করলো না।
সমাজের লোকজন বিভিন্ন জনে বিভিন্ন রকমের বিধান বাতলাতে লাগলো। কেহ বললো যবনান্ন ভোজীকে আদৌ সমাজে গ্রহন করার কোন বিধান নেই। আবার কেহ কেহ “ মিষ্টান্নম ইতরে জনা” র বিধান দিতে লাগলেন। দুঃখিনী জননী পদ্মাবতীর সে সামর্থ কোথায়? তার যে জীবন ধারণেরই ব্যবস্থা নেই। তিনি নিরুপায়। তার এমন সঙ্গতি ছিল না যে, রসনা তৃপ্তিকর অন্নব্যঞ্জনাদি সহযোগে সমাজকে তৃপ্ত করিয়ে স্বীয় পুত্রকে ঘরে নিবার জন্য তৎক্ষণাৎ অনুমতি লাভ করবন। তারপর শুধু কি তাই? পুত্রের শ্রাদ্ধাদি সম্পন্ন হয়েছে, এখন প্রায়শ্চিত্ত প্রয়োজন। কপর্দকহীন জননী কি দিয়ে এতো কিছু করবেন। সব কিছুর সহজ সমাধানের জন্য কেবলই শুধু অর্থের প্রয়োজন। তাই জননী পদ্মাবতীর সকল প্রত্যাশা অনর্থই থেকে গেলো। কারণ পদ্মাবতী এখন পথের ভিখারী। তার ছেলে নিজগৃহে পরের সন্তানের মতো বাস করতে হবে। এই বেদনায় জননী তখন উন্মাদিনী। হারানো মাণিক ফিরে পেয়েও বুকে নিতে পারছেন না, এমন দুঃখী জননী পৃথিবীতে আর বোধ হয় দ্বিতীয়টি নেই। দ্বিতীয় দিনেও প্রাণাধিক পুত্রকে মাতা কদলীপত্রে ভোজন করালেন।
কিন্তু মোহাবিষ্ট হয়ে লালন যে নির্দিষ্ট গন্ডিতে আবদ্ধ হতে এ জগতে আসেননি। রবীঠাকুরের উপেনের মতো সান্ত্বনা মিললো এই বলে যে, “ তাই লিখে দিল বিশ্ব নিখিল ,দু’বিঘার পরিবর্তে।”
এই সময়ে যশোহর জিলার ফুলবাড়ি গ্রামে সিরাজ সাঁই নামক জনৈক দরবেশ বাস করতেন। লালন যখন তাঁর জীবনদাত্রী জননীর বস্ত্রবয়ন-গৃহে শায়িত, তখন ঘটনাচক্রে দরবেশ সিরাজ সাঁই এই গ্রামে আসলেন। তিনি লালনের জীবন বৃত্তান্ত শুনে তাঁর রোগশয্যার পার্শ্বে এসে সমাসীন হলেন। একটু সুস্থ হলে সিরাজ সাঁই তাঁকে উপদেশ দিতে আরম্ভ করেন। সিরাজ সাঁইয়ের প্রাণস্পর্শী উপদেশ লালনের হৃদয়কে সিক্ত করলো। তাঁর হৃদয়ে এক অভিনব ভাবের উদয় হতে শুরু হলো। উপদেশ রাশি লালনের যাতনাক্লিষ্ট প্রাণে এক নব পর্যায় এনে দিল। তিনি সংকীর্ণ সমাজের বাহ্যাড়ম্বর ও ক্ষুদ্র গন্ডীর প্রতি ভ্রু-ভঙ্গি করে বিস্তীর্ণ ও আলোকময় রাজ্যে প্রবেশ করতে ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। অতঃপর স্বীয় জননীকে প্রণাম পূর্বক স্ত্রীর নিকট হতে শেষ বিদায় নিয়ে জন্মের মতো গৃহ ত্যাগী হলেন। (চলবে )

বাংলাদেশ সময়: ২০:২০:০৫ ● ৪৬ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ